Logo
ট্রেন্ডিং: ময়মনসিংহ মহানগর জাপার সভাপতি জাহাঙ্গীর গ্রেফতার বগুড়ার ধুনটে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হোন্ডা-গুণ্ডার রাজনীতি আর চলবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ কক্সবাজারে ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ দুই নারী আটক

বগুড়ায় ভুয়া জন্ম সনদে বাড়ছে বাল্যবিবাহ

BN DESK
19 July 2026, 11:05 AM পড়তে ১ মিনিট

নাসিমা সুলতানা ছুটু : বগুড়া শহরের অনতিদূর চালিতাবাড়ি ইউনিয়নের চোদ্দ বছরের কিশোরী মারুফার (ছদ্মনাম) জন্ম ২০১৩ সালে। স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে সে সপ্তম শ্রেণিতে পড়ালেখা করে। মাসখানিক আগে পরিবারের চাপে এই বয়সেই তাকে বিয়ের পীড়িতে বসতে হয়। তবে বিয়ের আইনি বয়স (নূন্যনতম ১৮ বছর) না হওয়ায় মারুফার পরিবার আশ্রয় নেয় প্রযুক্তির অপব্যবহারের।

স্থানীয় এক দালালের মাধ্যমে মাত্র আড়াই হাজার টাকার বিনিময়ে একটি ভুয়া অনলাইন জন্ম নিবন্ধন সনদ তৈরি করা হয়। বগুড়া শহরের একটি কম্পিউটারের দোকানে তার বয়স ছয় বছর বাড়িয়ে জন্মসাল ২০১৩ এর পরিবর্তে ২০০৭ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি করা হয়। নতুন তৈরি করা সেই ভুয়া সনদ দিয়ে রাতারাতি মারুফাকে আইনিভাবে ‘প্রাপ্তবয়স্ক’ বানিয়ে বিয়ে সম্পন্ন করা হয়।

অপরদিকে বগুড়ার গাবতলী উপজেলার আলাল-মাহিয়া (ছদ্মনাম) দম্পতির বিয়ে সম্পন্ন হয় ২০২২ সালের ২১ ডিসেম্বর। জাতীয় পরচয়পত্র অনুযায়ী তখন আলালের বয়স ছিলো ১৮ বছর ৮ মাস ৪দিন। আর তার স্ত্রী মাহিয়া তখন ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। বর্তমানে মাহিয়ার বয়স ১৭ বছর এবং আলালের ২২ বছর ৩ মাস। কিন্তু ওইদিন তাদের বিয়ে রেজিস্ট্রিতে আলালের বয়স দেওয়া হয়েছে ২১ বছর এবং মাহিয়ার ১৯ বছর। আলাল-মারুফার বিয়ের সময় বয়স বাড়িয়ে কীভাবে বিয়ের আইনী বয়স করা হয়েছে সে বিষয়ে আলাল কিছু জানেন না। তবে তার অভিভাবকরা এই কাজটি করেছেন বলে তিনি জানান।

বগুড়ায় মারুফার মত অনেক কিশোরীরই কাগজের বয়স বাড়িয়ে বিয়ের মাধ্যমে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে শৈশব। সরকারি জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন  সার্ভারের আদলে হুবহু নকল ও জালিয়াতি করা সনদের ওপর ভর করে জেলায় আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে বাল্যবিয়ে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) এর সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী বাল্যবিয়ের উচ্চহারের দেশের শীর্ষ তিন জেলার মধ্যে বগুড়া একটি।

এই জেলায় ১৮ বছরের নীচে বাল্যবিয়ের হার ৬৩ শতাংশ। জেলার সারিয়াকান্দি এবং শিবগঞ্জ উপজেলাকে বাল্যবিয়ের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ উপজেলা হিসেবে ওই জরিপে উল্লেখ করা হয়েছে। অনুসন্ধানে জানা গেছে, বগুড়া শহরের সপ্তপদী মার্কেট, জজকোর্ট চত্বর এবং রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে বসা বেশ কিছু কম্পিউটার ও ফটোকপির দোকানগুলোকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে এই জালিয়াতি সিন্ডিকেট। ৫শ’ থেকে ৫ হাজার টাকা হলেই কিশোরীকে বানানো হচ্ছে যুবতী।

মিলছে ভুয়া জন্ম সনদ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কম্পিউটার অপারেটর জানান, সরকারি জন্ম নিবন্ধন পোর্টালের মূল কিউআর কোড গ্রাফিক্সের মাধ্যমে এডিট করে কিংবা পুরনো কোনো আসল সনদের ওপর এডিটিং সফটওয়্যার দিয়ে নতুন নাম, পিতার নাম ও বয়স বসিয়ে দেওয়া হয়। প্রিন্ট করার পর এই সনদগুলো দেখতে হুবহু আসল সনদের মতোই দেখায়, যা খালি চোখে সাধারণ মানুষের পক্ষে ধরা অসম্ভব। তবে জাল সনদ তৈরি করার ক্ষেত্রে কোনো কোনো কাজী জড়িত বলেও অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।

নিয়ম অনুযায়ী বিয়ে নিবন্ধনের আগে বর-কনের জন্ম সনদ জাতীয় তথ্য ভাণ্ডার থেকে ‘ই-ভেরিফাই’ করার কথা থাকলেও মাঠ পর্যায়ে তা মানা হচ্ছে না। অধিকাংশ কাজী বা নিকাহ রেজিস্ট্রার কেবল কম্পিউটার থেকে প্রিন্ট করা কাগজের কপিটি দেখেই বিয়ে রেজিস্ট্রি করে দিচ্ছেন।

অনেক ক্ষেত্রে ভুয়া জন্ম সনদ যাচাই করা হয় না জানিয়ে বগুড়া জেলা কাজী সমিতির একটি অংশের সভাপতি কাজী মো. মুনজুরুল হক  বলেন, ‘আমাদের সবসময় লাইভ সার্ভার চেক করার সুযোগ থাকে না।

খুব কম কাজীই আছেন যারা চেক করেন। গ্রামাঞ্চলে অনেক সময় ইন্টারনেট বা সার্ভার ডাউন থাকে। এছাড়া অভিভাবকরা যখন চেয়ারম্যানের স্বাক্ষর ও সিলসহ অনলাইন কপি নিয়ে আসেন, তখন সেটি বিশ্বাস করা ছাড়া উপায় থাকে না। কাজী মুনজুরুল হক দৈনিক করতোয়াকে আরও জানান, বগুড়া কোর্ট চত্বরে ভ্রাম্যমাণ কাজীদের মেলা রয়েছে।

এসব কাজীই মূলত: কোর্ট ম্যারেজের নামে ভুয়া জন্ম সনদ সংগ্রহ করে বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন। অনেক কাজী ক্যাটালগভূক্ত সরকারি রেজিস্টার বই ফটোকপির মাধ্যমে বাঁধাই করে নিয়ে নকল নিকাহ্নামা বই তৈরি করেন। এই বইয়ে তারা অপ্রাপ্ত বয়সী ছেলে-মেয়েদের বিয়ে রেজিস্ট্রি করেন বলে তিনি জানান। এই বিষয়ে কাজী সমিতির পক্ষ থেকে জেলা রেজিস্টার অফিসে কয়েকবার অভিযোগ করেও কোনো সুরাহা হয়নি বলে কাজী মুনজুরুল হক জানান।

বগুড়া জেলা কাজী সমিতির আরেক অংশের সভাপতি কাজী আবু বকর সিদ্দিকও কাজী মুনজুরুল হকের মত ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বগুড়া কোর্ট চত্বরে কিছু আইনজীবী এবং মহুরীর পৃষ্টপোষকতায় বেশ কিছু কাজী ভুয়া জন্ম সনদের সহযোগিতায় ‘কোর্ট ম্যারেজের’ নামে বাল্য বিয়ে করিয়ে থাকেন। এই বিষয়ে আমরা জেলা রেজিস্টারসহ জেলা প্রশাসকের কাছে বার বার অভিযোগ করেও কোনো ফল পাইনি।

তবে কোর্ট চত্বরে যে কাজীরা এই কাজ করান তাদের অধিকাংশই বগুড়ার আশে-পাশের (দুপচাঁচিয়া, কাহালু, শাজাহানপুর, গাবতলী, শিবগঞ্জ) উপজেলা থেকে আসেন। বগুড়া সদরেরও দুই একজন এর সাথে জড়িত রয়েছেন বলে তিনি জানান।

জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতি করে বাল্যবিয়ে দেওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া জেলা রেজিস্ট্রার সিরাজুল করিম জানান, এই ধরনের জালিয়াতি বা অনিয়মের বিষয়ে তার দপ্তরে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ আসেনি। তবে জেলা কাজী সমিতির পক্ষ থেকে বিয়ে নিয়ে একটিমাত্র লিখিত অভিযোগ এসেছিল, যা বয়স সংক্রান্ত ছিল না। সেই অভিযোগটিরও তদন্ত শুরুর আগেই সমিতি তা প্রত্যাহার করে নেয়।

তিনি আরও বলেন, ‘অনলাইনে বিয়ে (নিকাহনামা) রেজিস্ট্রি বাধ্যতামূলক করা হলে বাল্যবিয়েসহ সব ধরনের জালিয়াতি দূর করা সম্ভব। বর্তমানে অধিকাংশ কাজী ফিচার ফোন বা বাটন মোবাইল ব্যবহার করেন। ফলে বিয়ের অনুষ্ঠানস্থলে বসে তাদের পক্ষে অনলাইনে জন্ম সনদের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয় না।’ কাজী সমিতির পক্ষ থেকে অপরাধী কাজীদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

জন্ম নিবন্ধন সনদ জালিয়াতির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে বগুড়া মহানগরের মেয়র এম আর ইসলাম স্বাধীন দৈনিক করতোয়াকে বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আমরা ঘটনাটি তদন্ত করে দেখব। পৌরসভার সার্ভার ব্যবহার করে আমাদের কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী বা বাইরের কেউ যদি এমন জালিয়াতির সাথে জড়িত থাকে, তবে তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

বগুড়ার জেলা প্রশাসক মো. তৌফিকুর রহমান এই বিষয়ে বলেন, ‘ডিজিটাল সনদের এই জালিয়াতির আমার জানা নেই। তবে বিভিন্ন উপায়ে বাল্য বিয়ে হচ্ছে, এই ব্যাপারটি শুনেছি। আমাদের কাছে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এলেই আমরা ব্যবস্থা নিতে পারি। এছাড়া জন্ম নিবন্ধন জালিয়াতির বিষয়ে আমরা প্রমান পেলে সেই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেবো।’

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
বিশেষ প্রতিবেদন

বগুড়ায় ভুয়া জন্ম সনদে বাড়ছে বাল্যবিবাহ

B
BN DESK | 18 July 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার