Logo
ট্রেন্ডিং: ময়মনসিংহ মহানগর জাপার সভাপতি জাহাঙ্গীর গ্রেফতার বগুড়ার ধুনটে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হোন্ডা-গুণ্ডার রাজনীতি আর চলবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ কক্সবাজারে ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ দুই নারী আটক

বানের জলে ভাসছে মানুষ: এখনই মানবিক সংহতির সময়

BN DESK
13 July 2026, 04:19 PM পড়তে ১ মিনিট

বাংলাদেশ প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যে ভরপুর একটি বদ্বীপ রাষ্ট্র। অসংখ্য নদ—নদী, বিস্তীর্ণ উপকূল, উর্বর ভূমি এবং সবুজ বনভূমি এ দেশকে যেমন সমৃদ্ধ করেছে, তেমনি প্রাকৃতিক দুর্যোগের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে। প্রতিবছর বর্ষা এলেই দেশের কোথাও না কোথাও বন্যা, নদীভাঙন, জলোচ্ছ্বাস কিংবা পাহাড়ধসের সংবাদ আসে। সা¤প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বন্যা, পাহাড়ি ঢল ও ভূমিধসের ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে দুর্যোগ আর বিচ্ছিন্ন কোনো ঘটনা নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতায় দুর্যোগ মোকাবিলাকে কেবল ত্রাণ কার্যক্রমের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতি ও জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করতে হবে।

প্রাণহানি, গবাদিপশু ও কৃষিতে নজিরবিহীন ক্ষয়ক্ষতি : চলমান বন্যা ও পাহাড়ধস শুধু জনজীবনকেই বিপর্যস্ত করেনি, সৃষ্টি করেছে ব্যাপক প্রাণহানি ও অর্থনৈতিক ক্ষয়ক্ষতি। সরকারি প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, বান্দরবান, রাঙামাটি ও মৌলভীবাজারসহ ক্ষতিগ্রস্ত জেলাগুলোতে বহু মানুষের মৃত্যু ও আহত হওয়ার ঘটনা ঘটেছে। কক্সবাজারে পাহাড়ধস ও পানিতে ডুবে সর্বাধিক প্রাণহানি ঘটেছে, যাদের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দার পাশাপাশি রোহিঙ্গা শরণার্থীও রয়েছেন। চট্টগ্রামেও বন্যা ও দেয়ালধসের ঘটনায় প্রাণহানির পাশাপাশি অনেকে আহত হয়েছেন। হাজার হাজার পরিবার ঘরবাড়ি হারিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে মানবেতর জীবনযাপন করছে। একই সঙ্গে গবাদিপশুর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে; অসংখ্য গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, হাঁস ও মুরগি বানের পানিতে ভেসে গেছে বা খাদ্য ও আশ্রয়ের অভাবে মারা গেছে। বহু এলাকায় গোয়ালঘর ও খামার তলিয়ে যাওয়ায় খামারিরা বছরের সঞ্চিত সম্পদ মুহূর্তেই হারিয়েছেন। পশুখাদ্যের সংকট ও পশুচিকিৎসা সেবার সীমাবদ্ধতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

কৃষি, মৎস্য ও গ্রামীণ অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক আঘাত : বন্যার সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক অভিঘাত নেমে এসেছে কৃষি ও মৎস্য খাতে। হাজার হাজার হেক্টর আউশ ধান, আমন বীজতলা, সবজি ক্ষেত, ফলের বাগান এবং অন্যান্য ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। মাছের ঘের, পুকুর ও জলাশয় ভেসে যাওয়ায় কোটি কোটি টাকার মৎস্যসম্পদের ক্ষতি হয়েছে। গ্রামীণ সড়ক, সেতু, কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাজার, ধর্মীয় উপাসনালয়, বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ অবকাঠামোরও ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। বহু কৃষক তাদের মৌসুমি উৎপাদন হারিয়ে নতুন করে চাষাবাদের অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুর, জেলে ও পরিবহনশ্রমিকদের আয় প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তাৎক্ষণিক ত্রাণ সহায়তার পাশাপাশি কৃষি পুনর্বাসন, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের আর্থিক সহায়তা, গবাদিপশুর জন্য জরুরি খাদ্য ও চিকিৎসা এবং ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামোর দ্রুত পুননির্মাণ নিশ্চিত করা না গেলে এই দুর্যোগের অর্থনৈতিক প্রভাব দীর্ঘ সময় ধরে গ্রামীণ জনজীবনে বিরূপ প্রভাব ফেলবে। কেন বাড়ছে বন্যার ক্ষয়ক্ষতি? বন্যা বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্যের অংশ হলেও বর্তমানে এর ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি হচ্ছে। নদী ভরাট, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, খাল—বিল দখল, জলাধার ভরাট এবং দুর্বল নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে সামান্য অতিবৃষ্টিতেও বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। অনেক স্থানে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। ফলে কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও ব্যবসা—বাণিজ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত কারা? দুর্যোগের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করেন নিম্নআয়ের মানুষ। কৃষক হারান ফসল, জেলে হারান জাল ও নৌকা, দিনমজুর হারান কাজ, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী হারান পুঁজি। অনেক শিশুর পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যায়, নারীরা স্বাস্থ্যঝুঁকিতে পড়েন এবং বয়স্ক ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সবচেয়ে বেশি কষ্ট ভোগ করেন। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।

এই মুহূর্তে কী করা জরুরি? দুর্যোগকবলিত এলাকায় দ্রুত উদ্ধার অভিযান, পর্যাপ্ত ত্রাণ, বিশুদ্ধ পানি, শুকনো খাবার, শিশু খাদ্য, ওষুধ, স্যানিটেশন এবং চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রে নারী, শিশু ও প্রবীণদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি গবাদিপশুর খাদ্য, কৃষকদের বীজ ও কৃষি উপকরণ সরবরাহের বিষয়েও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ : প্রতি বছর একই ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়াতে নদী খনন, খাল পুনরুদ্ধার, জলাধার সংরক্ষণ, আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থা, টেকসই বাঁধ নির্মাণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে জলবায়ু সহনশীল কৃষি, গবেষণা, প্রযুক্তি এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থায় আরও বিনিয়োগ জরুরি। মানবিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি : দুর্যোগের সময় বাংলাদেশের মানুষ বারবার মানবিকতার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষার্থী, চিকিৎসক, গণমাধ্যম, সামাজিক সংগঠন, ব্যবসায়ী ও প্রবাসী বাংলাদেশিরা নানা সময়ে দুর্গত মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছেন। এই মানবিক চেতনা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন। যার যতটুকু সামর্থ্য আছে, তা দিয়ে এগিয়ে আসাই আজকের সময়ের দাবি।

সরকারের পাশাপাশি সবার দায়িত্ব : দুর্যোগ মোকাবিলা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষেরও ভূমিকা রয়েছে। স্থানীয় সরকার, জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্বেচ্ছাসেবক, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সবাই সমন্বিতভাবে কাজ করলে ক্ষয়ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে দুর্যোগ—পরবর্তী পুনর্বাসন, কর্মসংস্থান ও শিক্ষা পুনরুদ্ধারের দিকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভবিষ্যতের বাংলাদেশ কেমন হবে? জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় বাংলাদেশকে আরও বিজ্ঞানভিত্তিক, পরিবেশবান্ধব এবং দুর্যোগ—সহনশীল রাষ্ট্রে পরিণত করতে হবে। উন্নয়নের প্রতিটি পরিকল্পনায় জলবায়ু ঝুঁকি বিবেচনা করা, গবেষণায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং তরুণ প্রজন্মকে পরিবেশ সংরক্ষণে সম্পৃক্ত করা এখন সময়ের অপরিহার্য দাবি।

লেখক :

জুবাইয়া বিন্তে কবির

অর্থনীতিবিদ, গবেষক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট

 

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
উপ-সম্পাদকীয়

বানের জলে ভাসছে মানুষ: এখনই মানবিক সংহতির সময়

B
BN DESK | 13 July 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার