Logo
ট্রেন্ডিং: ময়মনসিংহ মহানগর জাপার সভাপতি জাহাঙ্গীর গ্রেফতার বগুড়ার ধুনটে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হোন্ডা-গুণ্ডার রাজনীতি আর চলবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ কক্সবাজারে ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ দুই নারী আটক

রত্নগর্ভা ও আমাদের বিবেকের প্রশ্ন

BN DESK
06 June 2026, 10:01 PM পড়তে ১ মিনিট

মা হচ্ছেন একজন নারী, যিনি গর্ভধারণ, সন্তানের জন্ম তথা সন্তানকে বড় করে তোলেন - তিনিই অভিভাবকের ভূমিকা পালনে সক্ষম ও মা হিসেবে সর্বত্র পরিচিত। যে গর্ভে রত্ন জন্ম নেয় সেই গর্ভই তো রত্নের আঁধার। আর এই আঁধারের অধিকারী মা-ই হলেন রত্নগর্ভা। বাংলাদেশে যে মায়েদের কমপক্ষে তিনজন সন্তান বিভিন্ন ক্ষেত্রে সফল ও প্রতিষ্ঠিত তাদের রত্নগর্ভা মা আখ্যায়িত করা হয়। ‘রত্নগর্ভা মা অ্যাওয়ার্ড’ পুরস্কারের প্রচলন করেন আবুল কালাম আজাদ। এই অ্যাওয়ার্ড ২০০৩ সালে চালু করা হয়। প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মায়ের স্বীকৃতিস্বরূপ এ পুরস্কার প্রদান করা হয়। মায়েদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো এ পুরস্কারের অন্যতম লক্ষ্য। প্রতি বছর বিশ্ব মা দিবসে এ পুরস্কারের আয়োজন করা হয়। মায়ের ভালোবাসা হলো পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ও পবিত্র অনুভূতি। কোনো শর্ত বা প্রতিদান ছাড়াই মা তার সন্তানকে আজীবন আগলে রাখেন। নিজের সব কষ্ট হাসিমুখে সহ্য করে সন্তানের মুখে হাসি ফোটানোই যার একমাত্র ব্রত। মায়ের মমতা ও আশীর্বাদ সন্তানের জীবনের পরম শক্তি। মায়ের ভালোবাসায় না আছে কোনো কৃত্রিমতা, না আছে কোন ভণিতা, না আছে কোন অভিনয়। পৃথিবীর সব সম্পর্কের পেছনে কোনো না কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু মায়ের ভালোবাসা সম্পূর্ণ নিঃস্বার্থ। নিজের সব সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিয়ে মা তার সন্তানের ভবিষ্যৎ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। যে ভালোবাসার দৈর্ঘ্য প্রস্থ ও গভীরতা পরিমাপ করার কোন স্কেল বা ব্যারোমিটার এখনো এই পৃথিবীতে আবিষ্কৃত হয় নাই। এটি শুধুই মমতাময়ী মায়ের সুখ অনুভূতির বিশেষ বহিঃপ্রকাশ যা শত সহস্র কষ্টকে নিমিষে অতিক্রম করতে পারে। তাইতো কবি কামিনী রায়ের কত ভালোবাসি কবিতায় এমনিভাবে প্রকাশ পেয়েছে মায়ের ভালোবাসা । 


“কত ভালবাস ধন?” জননী শুধায়।/“এ-ত।” বলি দুই হাত প্রসারি’ দেখায়।/“তুমি মা আমারে ভালবাস কতখানি?”/মা বলেন “মাপ তার আমি নাহি জানি।” দীর্ঘ ১০ মাসের গর্ভধারণ থেকে শুরু করে সন্তান প্রসব, দুধ পান করানো, ধীরে ধীরে তাকে বড় করে তোলা এবং আদর-যত্ন দিয়ে তার মধ্যে মানবিক গুণাবলির বিকাশ ঘটানোর যে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে একজন মা যান, তার কোনো তুলনা পৃথিবীতে নেই। এ ক্ষেত্রে মায়ের তুলনা মা-ই। এত কষ্ট, এত যন্ত্রণা সহ্য করার ক্ষমতা অন্য কারও নেই। এ কারণেই মা অনন্য। এটিই তাঁর অতুলনীয় মর্যাদার প্রধান কারণ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহতাআলা একাধিকবার মায়ের এসব ত্যাগের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি মানুষকে নির্দেশ দিয়েছি তার মা-বাবার প্রতি সদয় আচরণের। তার মা নিদারুণ কষ্টে তাকে গর্ভে ধারণ করেন এবং নিদারুণ কষ্ট সহ্য করে তাকে প্রসব করেন। তাকে গর্ভে ধারণ করতে এবং দুধপান ছাড়াতে সময় লাগে ৩০ মাস। অবশেষে সে যখন পূর্ণ শক্তি লাভ করে এবং ৪০ বছরে পৌঁছে যায়, তখন সে বলে হে আমার প্রতিপালক, আপনি আমাকে আর আমার মা-বাবাকে যে নিয়ামত দিয়েছেন, তার জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার শক্তি আমাকে দান করুন...।’ (সুরা আহকাফ: ১৫)। 

সনাতন ধর্মে উল্লেখ আছে স্ববংশবৃদ্ধিকামঃ পুত্রমেকমাসাদ্য..”। আবার সন্তান লাভের পর নারী তাঁর রমণীমূর্তি পরিত্যাগ করে মহীয়সী মাতৃরূপে সংসারের অধ্যক্ষতা করবেন। তাই মনু সন্তান প্রসবিনী মাকে গৃহলক্ষ্মী সম্মানে অভিহিত করেছেন। তিনি মাতৃ গৌরবের কথা বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন এভাবে- উপাধ্যায়ান্ দশাচার্য্য আচায্যাণাং শতং পিতা। সহস্রন্তু পিতৃন্মাতা গৌরবেণাতিরিচ্যতে” (মনু, ২/১৪৫) অর্থাৎ “দশজন উপাধ্যায় (ব্রাহ্মণ) অপেক্ষা একজন আচার্য্যরে গৌরব অধিক, একশত আচার্য্যরে গৌরব অপেক্ষা পিতার গৌরব অধিকতর; সর্বোপরি, সহস্য পিতা অপেক্ষা মাতা সম্মানার্হ।”

পৃথিবীতে সকল মায়ের মর্যাদাই সমান। ধনী-গরিব, উঁচু-নিচু সকল মা একই রকম পরিশ্রম, ত্যাগ এবং ভালোবাসার গভীর মমতায় সন্তানের জন্মদান এবং  পালন করে থাকেন। এমনকি সকল জীবের মধ্যেই মা প্রাণীটির ত্যাগ এবং পরিশ্রম একই রকম। সাধ্যের ভিতরে থেকে নিজের নাড়িছেড়া ধনকে জগতের সর্বোচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করার অদম্য প্রচেষ্টায় সর্বদা নিমগ্ন থাকেন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে আধুনিকতার অধিকতর ছোঁয়ায় মায়েদের মধ্যে সন্তানকে প্রতিষ্ঠিত করার এক অদম্য দূর্ভেদ্য প্রতিযোগিতা চলছে। শহরের নামিদামি স্কুলে প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হতে শুরু করে কলেজের গুন্ডি পার হয়ে জগৎ বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি এবং সেখান থেকে উচ্চ ডিগ্রি নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পিছনে বাবা মার সর্বোচ্চটুকু দিয়ে ত্যাগের এক অনন্য নজির স্থাপন করার প্রতিযোগিতায় ব্যস্ত। এই প্রতিষ্ঠিত করার প্রতিযোগিতা যতটা বাড়ছে মনে হচ্ছে মানুষ হওয়ার প্রতিযোগিতাটা ততটা পিছিয়ে পড়ছে। একজন মা সন্তানের উচ্চ ডিগ্রী লাভ এবং সমাজে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার জন্য যেভাবে রাত দিন এক করে চলছেন ততটা কি খেয়াল করছেন সন্তানের মানবতা কতটুকু ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ছে। দেশ-বিদেশের উচ্চতর ডিগ্রী অবশ্যই সন্তানের জন্য ভালো কিছু বয়ে নিয়ে আসে। কিন্তু তার পিছনে সন্তান পিতা-মাতার ভালোবাসা ও মানবিক বন্ধন থেকে কতটুকু বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে তা কি কখনো আমরা অভিভাবক হিসাবে বিবেচনা করছি। আবার যদি অন্যদিকে একটু নজর দেই আধুনিকতার নামে বাবা-মা দুজনেরই চাকরির ব্যস্ততার কারণে বাচ্চাটি হয় শিশু সদন অথবা বাড়ির কাজের মেয়ের কাছে কিভাবে মানুষ হচ্ছে। কি ধরনের ভাষা ব্যবহার আচার-আচরণ ও মানবিকতা নিয়ে গড়ে উঠছে এটা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। ব্যস্ততম  শহরে যত বেশি শিশু পরিষেবা কেন্দ্র গড়ে উঠছে একই সাথে পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধাশ্রম এর সংখ্যাও বেড়ে চলছে। এর উপর গবেষণা এবং সতর্কতার সময় এসেছে। একান্নবর্তী পরিবারের যে মায়া যে ভালোবাসা এবং মমতার বন্ধন ছিন্ন হওয়া শুরু হয়েছে তেমনিভাবে তাল মিলিয়ে বৃদ্ধ বয়সে বাবা মার কষ্ট অবহেলা বেড়ে চলছে। এমনই রুঢ় বাস্তবতায় আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করি আমরাও তো বৃদ্ধ হব, তখন আমার এই প্রিয় সন্তানটি আমার প্রতি কতটা ভালোবাসায় আবদ্ধিত থাকবে। আমাকে কতটা সম্মান ও সমীহ করে বৃদ্ধ বয়সে পরিষেবা নিশ্চিত করবে। 

ছেলেকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, আমলা, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অথবা ফাস্ট ওয়াল্ড কান্ট্রির কোন দেশের সু প্রতিষ্ঠিত নাগরিক করে বাবা-মাই শেষ বয়সে বৃদ্ধাশ্রমে অন্ধকার কুঠুরিতে বন্দি হয়ে পারিবারিক সকল মায়া মমতা ও ভালবাসার বন্ধন থেকে বঞ্চিত হয়ে তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাবো এমন জীবন তো আমরা চাই না। আবার এমন কোনো জীবনও চাইনা যেখানে প্রতিষ্ঠিত সন্তানেরা সময়ের অভাবে বাবা-মার খোঁজখবর পর্যন্ত নিতে পারে না। বছরের উল্লেখযোগ্য দিনগুলোতেও একটু সময় হয় না। একটা ফোন করে বাবা মার সাথে কথা বলা, তাদের শরীরের খোঁজ খবর নেওয়া, ডাক্তার দেখানো, ঔষধপত্রের সুব্যবস্থা করা এগুলো তো শুধুই মানবতা নয় সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত দায়িত্ব। পবিত্র কোরআনে ইরশাদ হয়েছে, ‘আর আপনার রব আদেশ দিয়েছেন তিনি ছাড়া অন্য কারো ইবাদত না করতে ও মা-বাবার প্রতি সদ্ব্যবহার করতে। তারা একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হলে তাঁদের উফ বোলো না এবং তাঁদের ধমক দিয়ো না; তাঁদের সঙ্গে সম্মানসূচক কথা বলো। (সুরা : বনি ইসরাঈল, আয়াত : ২৩)

আবার শিক্ষিত হয়ে ছলে বলে কৌশলে অশিক্ষিত অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মার কাছ থেকে তাদের শেষ সহায়-সম্পদটুকুও নিজের নামে অবৈধভাবে লিখে নিয়ে তাদেরকে চরম বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দেওয়া সেই অভাগা সন্তান কিভাবে আমি হতে পারি। অথচ নিজের সন্তান যখন অসুস্থ সেই অসুস্থ সন্তানের পাশে বসে বিরোহী মায়ের মনের চরম আকুতি আর বেদনার মর্মধ্বনি প্রকাশ পেয়েছে পল্লী কবি জসিম উদ্দিন এর পল্লী জননী কবিতায়- “রুগ্ন ছেলের শিয়রে বসিয়া একেলা জাগিছে মাতা,/করুণ চাহনি ঘুম ঘুম যেন ঢুলিছে চোখের পাতা। /শিয়রের কাছে নিবু নিবু দীপ ঘুরিয়া ঘুরিয়া জ্বলে,/তারি সাথে সাথে বিরহী মায়ের একেলা পরাণ দোলে।”

এই সন্তান যখন বড় হয়ে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাবা-মার কোন খোঁজ-খবর না রাখার কারণে বাবা-মা মারা যাওয়ার পরে শরীরে পোকার জন্ম নেয়, যে পবিত্র গর্ভ থেকে এই ধরনের সুপ্রতিষ্ঠিত সন্তানের জন্ম হয়েছে সেই গর্ভটি কি আসলেই রত্নের আঁধার থাকবে না অন্য কোন কিছুর  আঁধারে পরিণত হবে বিবেকের কাছে প্রশ্ন । পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা। 

লেখক :

অধ্যাপক ড. মো: গোলাম ছারোয়ার

শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
উপ-সম্পাদকীয়

রত্নগর্ভা ও আমাদের বিবেকের প্রশ্ন

B
BN DESK | 06 June 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার