Logo
ট্রেন্ডিং: ময়মনসিংহ মহানগর জাপার সভাপতি জাহাঙ্গীর গ্রেফতার বগুড়ার ধুনটে নানাবাড়িতে বেড়াতে এসে পানিতে ডুবে শিশুর মৃত্যু হোন্ডা-গুণ্ডার রাজনীতি আর চলবে না: হাসনাত আব্দুল্লাহ কক্সবাজারে ইয়াবা ও নগদ টাকাসহ দুই নারী আটক

শিয়া-সুন্নি বিরোধ: ক্ষমতার উত্তরাধিকার থেকে মতাদর্শের বিভাজন

BN DESK
07 August 2026, 12:50 PM পড়তে ১ মিনিট

সাজিদ ওয়াসিক বাধন : ইসলামের ইতিহাসে শিয়া-সুন্নি বিভাজনকে অনেক সময় কেবল ধর্মীয় মতভেদের ফল হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু ইতিহাসের গভীরে গেলে দেখা যায়, এর সূচনা ছিল মূলত রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও উত্তরাধিকারের প্রশ্নকে কেন্দ্র করে। নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর ইন্তেকালের পর মুসলিম সমাজের সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন ছিল কে নেতৃত্ব দেবেন এবং সেই নেতৃত্বের বৈধতার ভিত্তি কী হবে? এই প্রশ্নের দুটি ভিন্ন উত্তর থেকেই পরবর্তীকালে সুন্নি ও শিয়া মতবাদের বিকাশ ঘটে। একদিকে সাহাবিদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের মত ছিল যে, নবী কোনো নির্দিষ্ট উত্তরসূরি মনোনীত করে যাননি। তাই মুসলিম সমাজের পরামর্শ ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে একজন যোগ্য ব্যক্তিকে খলিফা নির্বাচন করা হবে। এই নীতির ভিত্তিতেই আবু বকর (রা.), এরপর উমর (রা.) এবং পরে উসমান (রা.) খলিফা নির্বাচিত হন। 

এই ধারাই পরবর্তীকালে সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তার ভিত্তি হয়ে ওঠে। অন্যদিকে আলীর (রা.) সমর্থকদের বিশ্বাস ছিল, নবী মুহাম্মদ (সা.) গাদির খুমে আলীকে তাঁর উত্তরসূরি হিসেবে মনোনীত করেছিলেন। তাদের মতে, মুসলিম নেতৃত্ব নবীর পরিবার আহলুল বাইতের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত। এই ধারণাই পরবর্তীকালে শিয়া মতবাদের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হয়ে ওঠে। তবে শুরুতে এই মতভেদ কেবল উত্তরাধিকারের প্রশ্নেই সীমাবদ্ধ ছিল। পরিস্থিতি জটিল হয়ে ওঠে তৃতীয় খলিফা উসমান (রা.)-এর শাসনামলে। প্রশাসনে আত্মীয় প্রীতির অভিযোগ, দ্রুত বিস্তৃত সাম্রাজ্যের রাজনৈতিক টানাপোড়েন এবং প্রাদেশিক অসন্তোষ একসময় বিদ্রোহে রূপ নেয়। শেষ পর্যন্ত উসমান (রা.) নিহত হন, যা মুসলিম ইতিহাসে প্রথম বড় রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করে। 

এরপর আলী (রা.) খলিফা নির্বাচিত হলেও বিরোধ থামেনি। উসমানের হত্যার বিচার নিয়ে মতবিরোধ, আয়িশা (রা.)-এর নেতৃত্বে জামালের যুদ্ধ এবং পরে সিরিয়ার গভর্নর মুয়াবিয়ার সঙ্গে সিফফিনের যুদ্ধ মুসলিম সমাজকে গভীরভাবে বিভক্ত করে। সালিশ গ্রহণের সিদ্ধান্তে আলীর নিজের অনুসারীদের একাংশও তাঁর বিরোধিতা করে এবং খারিজি নামে পৃথক একটি ধারার জন্ম হয়। ইসলামী ঐতিহ্যে এই সময়কে ফিতনাঅর্থাৎ গৃহবিভেদ বা অন্তর্দ্বন্দ্ব বলা হয়। এই ফিতনাই পরবর্তীকালে সুন্নি, শিয়া এবং খারিজি ইসলামের তিনটি প্রধান ঐতিহাসিক ধারার ভিত্তি স্থাপন করে। 

ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, প্রথম দিকের বিরোধ ছিল মূলত রাষ্ট্র পরিচালনা ও রাজনৈতিক বৈধতা নিয়ে। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই রাজনৈতিক বিরোধ ধর্মতত্ত্ব, আইন, ইমামত, হাদিসের গ্রহণযোগ্যতা এবং ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্নে বিস্তৃত হয়। ফলে যে মতভেদ একসময় নেতৃত্বের প্রশ্নে সীমাবদ্ধ ছিল, তা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে একটি গভীর ধর্মীয় ও সামাজিক বিভাজনে পরিণত হয়েছে। আজ, প্রায় চৌদ্দ শতাব্দী পরও বিশ্বের বহু বহু অঞ্চলে শিয়া-সুন্নি সম্পর্ক রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের কারণে নতুন করে উত্তেজিত হয়। অথচ উভয় সম্প্রদায়ই একই কুরআন, একই নবী এবং ইসলামের মৌলিক আকীদার প্রতি বিশ্বাসী। তাদের প্রধান মতপার্থক্য ইতিহাসের একটি সংকটময় মুহূর্তে নেতৃত্ব ও বৈধতার প্রশ্নকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল অতএব, ইতিহাসকে আবেগের নয়, গবেষণার আলোকে পড়া জরুরি। শিয়া-সুন্নি বিভাজনের উৎপত্তি বোঝার জন্য রাজনৈতিক বাস্তবতা, সামাজিক পরিবর্তন এবং ধর্মীয় ব্যাখ্যার পারস্পরিক সম্পর্ক অনুধাবন করতে হবে। ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে বিভেদ নয়, বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহাবস্থানের সংস্কৃতি গড়ে তোলাই আজকের সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।


লেখক: আইনজীবী ও প্রাবন্ধিক

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
উপ-সম্পাদকীয়

শিয়া-সুন্নি বিরোধ: ক্ষমতার উত্তরাধিকার থেকে মতাদর্শের বিভাজন

B
BN DESK | 07 August 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার