দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, পরিবেশ ও অর্থনীতিতে আমূল পরিবর্তন আনতে সাড়ে ৩৪ হাজার কোটি টাকার ‘পদ্মা ব্যারেজ’ প্রকল্পের চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে সরকার। ভারতের ফারাক্কা বাঁধের বিরূপ প্রভাবে সৃষ্ট দীর্ঘদিনের পানিসঙ্কট ও লবণাক্ততা দূর করে মরুকরণ রোধে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে বুধবার এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সভা অনুষ্ঠিত হয়। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) এই সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর এটি ছিল তৃতীয় একনেক বৈঠক, আর এই বৈঠকেই বর্তমান মেয়াদের প্রথম মহাপ্রকল্প (বিশাল বড় প্রকল্প) হিসেবে ‘পদ্মা ব্যারেজ’ বা পদ্মা পানি নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সভা শেষে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়।
প্রকল্পের বিস্তারিত বিবরণ থেকে জানা যায়, ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ের এই বিশাল প্রকল্পটি সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড এই প্রকল্পের তদারকি ও বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে যে, ২০৩৩ সালের জুনের মধ্যে এই বাঁধের নির্মাণ কাজ সমাপ্ত হবে। এর আগে গত ৬ মে পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানিয়েছিলেন যে, প্রকল্পের কারিগরি সমীক্ষা ও সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ সফলভাবে শেষ হয়েছে।
এই প্রকল্পের প্রধান উদ্দেশ্য হলো ভারতের ফারাক্কা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে যে তীব্র পানিশূন্যতা তৈরি হয়, তা মোকাবিলা করা। ফারাক্কার প্রভাবে দেশের একটি বিশাল অংশ জুড়ে মরুপ্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং লবণাক্ততা বেড়ে গিয়ে চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। রাজবাড়ী জেলার পাংশা নামক স্থানে পদ্মা নদীর ওপর এই ব্যারেজ বা বিশেষায়িত বাঁধটি নির্মাণ করা হবে। এখান থেকে সংরক্ষিত পানি বিভিন্ন খাল বা কৃত্রিম নালা (ক্যানেল) দিয়ে কৃষিজমিতে পৌঁছে দেওয়া হবে। এতে করে কেবল চাষাবাদই নয়, বরং নদীর নাব্য রক্ষা এবং মৎস্য সম্পদের বিকাশেও নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।
মহাপ্রকল্পটির সুফল ভোগ করবে দেশের চারটি বিভাগের ১৯টি জেলা। খুলনা, ঢাকা, রাজশাহী ও বরিশাল বিভাগের জেলাগুলো এই প্রকল্পের আওতায় সরাসরি উপকৃত হবে। বিশেষ করে গড়াই-মধুমতী, চন্দনা-বারাশিয়া, বড়াল, ইছামতী এবং হিসনা-মাথাভাঙ্গা নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করার বিশেষ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনে স্বাদু পানির প্রবাহ বাড়বে, যা বনের বাস্তুসংস্থান ও প্রাণবৈচিত্র্য রক্ষায় অপরিহার্য। এছাড়া যশোরের ভবদহ এলাকার মতো দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা প্রবণ অঞ্চলগুলোতে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটানো হবে।
প্রকৌশলগত দিক থেকে পদ্মা ব্যারেজ হবে ২ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি বিশাল কাঠামো। এতে থাকবে ৭৮টি জলকপাট (স্পিলওয়ে), ১৮টি তলদেশীয় নিষ্কাশন পথ (আন্ডার স্লুইস), দুটি মাছ চলাচলের পথ এবং নৌ-চলাচলের জন্য বিশেষ ব্যবস্থা (নেভিগেশন লক)। শুধু তাই নয়, এই বাঁধ থেকে ১১৩ মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনাও রাখা হয়েছে, যা জাতীয় গ্রিডে নবায়নযোগ্য জ্বালানির যোগান দেবে। নদীগুলোর নাব্যতা ধরে রাখতে গড়াই-মধুমতী নদীতে ১৩৫ কিলোমিটারের বেশি এবং হিসনা নদীতে ২৪৬ কিলোমিটার এলাকা পুনঃখনন করা হবে।
একনেকের এই সভায় পদ্মা ব্যারেজ ছাড়াও আরও আটটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে। সব মিলিয়ে ৯টি প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৬ হাজার ৬৯৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। এর মধ্যে মা ও শিশু স্বাস্থ্য সেবার উন্নয়নে ১৩২৯ কোটি টাকার প্রকল্প, সাভার সেনানিবাসে সৈনিকদের আবাসন সমস্যার সমাধান এবং চট্টগ্রাম সিটি আউটার রিং রোডের উন্নয়ন প্রকল্প অন্যতম। এছাড়া ঢাকা ও ময়মনসিংহে গ্যাস পাইপলাইন নির্মাণ এবং সরকারি শিশু পরিবারের ভবন পুনর্নির্মাণের জন্যও বড় অংকের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, অতীতে বিভিন্ন সময়ে এই প্রকল্পটি একনেক সভায় উপস্থাপিত হলেও নানা কারণে তা আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি গত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ও এটি নাকচ করা হয়েছিল। তবে বর্তমান সরকার পরিবেশগত ভারসাম্য ও কৃষকদের স্বার্থ বিবেচনা করে এটিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। যদিও আন্তঃদেশীয় নদী ব্যবস্থাপনায় ভারতের সাথে পানি বণ্টনের বিষয়টি নিয়ে কূটনৈতিক পর্যায়ে আলোচনার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্পটি কেবল একটি অবকাঠামো নয়, এটি বাংলাদেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফারাক্কার বিরূপ প্রভাবে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল যখন মরুভূমিতে রূপ নেওয়ার শঙ্কায় ছিল, তখন এই ব্যারেজ আশার আলো দেখাচ্ছে। তবে এত বিশাল বাজেটের প্রকল্পের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা এবং কাজের মান নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়া প্রতিবেশী দেশের সাথে পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদী এবং কার্যকরী সমঝোতায় পৌঁছানো না গেলে এই বাঁধের পূর্ণ সুবিধা পাওয়া কঠিন হতে পারে। জাতীয় সম্পদ ও পরিবেশ রক্ষায় এই প্রকল্প কতটুকু টেকসই হবে, তা এখন সময়ের দাবি।