পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সরকার গঠিত হয়েছে। এই ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের মহানায়ক ও রাজ্যের প্রথম বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে উষ্ণ অভিনন্দন জানিয়েছেন বাংলাদেশের জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের। এই নতুন নেতৃত্বের হাত ধরে দুই বাংলার মধ্যে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও পারস্পরিক সহযোগিতার নতুন দ্বার উন্মোচিত হবে বলে দৃঢ় প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
সোমবার ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় রাষ্ট্রদূতের কার্যালয়ের (হাইকমিশন) মাধ্যমে এই বিশেষ শুভেচ্ছা বার্তা পাঠানো হয়। জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে দেওয়া এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে গণমাধ্যমকে এ তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে।
শুভেচ্ছা বার্তায় জি এম কাদের বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন। তিনি বলেন, প্রতিবেশী রাজ্য পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের রয়েছে দীর্ঘ ও বিস্তৃত স্থলসীমান্ত। সীমানার কাঁটাতার পেরিয়ে দুই বাংলার সাধারণ মানুষের মধ্যে শতাব্দীপ্রাচীন গভীর সাংস্কৃতিক, ভাষাগত ও মানবিক সম্পর্ক আজও বহমান। জাতীয় পার্টি সবসময় সীমান্তের উভয় পাশের মানুষের শান্তি, উন্নয়ন ও কল্যাণে বিশ্বাস করে। জি এম কাদের আশা প্রকাশ করেন, শুভেন্দু অধিকারীর মতো একজন জনমুখী ও পরীক্ষিত নেতার নেতৃত্বে দুই বাংলার মানুষের মধ্যে বিরাজমান সৌহার্দ্য ও সহযোগিতার সম্পর্ক আগামী দিনগুলোতে আরও সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড়াবে।
উল্লেখ্য, সদ্য সমাপ্ত রাজ্য আইনসভা (বিধানসভা) নির্বাচনে এক অভাবনীয় ফল পেয়েছে বিজেপি। রাজ্যের মোট ২৯৩টি আসনের মধ্যে ২০৭টি আসনেই নিরঙ্কুশ জয় ছিনিয়ে নিয়ে প্রথমবারের মতো পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতার মসনদে বসেছে দলটি। অন্যদিকে, মাত্র ৮০টি আসন পেয়ে ভরাডুবি হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন দীর্ঘদিনের শাসক দল তৃণমূল কংগ্রেসের। এই বিপুল বিজয়ের পর গত শনিবার দলটির শীর্ষ নেতা শুভেন্দু অধিকারী আনুষ্ঠানিকভাবে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। তাঁর সঙ্গে মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছেন দলের আরও পাঁচ জ্যেষ্ঠ নেতা।
জি এম কাদের তাঁর বার্তায় নতুন মুখ্যমন্ত্রীর ঐতিহাসিক নির্বাচনী বিজয়কে পশ্চিমবঙ্গের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার এক অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ মাইলফলক বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি বলেন, এই সাফল্য কেবল একটি রাজনৈতিক দলের নয়, বরং এটি দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম, অটল দৃঢ়তা ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে জনগণের অকৃত্রিম আস্থা অর্জনের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।
বার্তায় শুভেন্দু অধিকারীর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক উত্থানের প্রশংসাও করেন জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান। পূর্ব মেদিনীপুরের এক অত্যন্ত প্রভাবশালী ও ঐতিহ্যবাহী রাজনৈতিক পরিবারে জন্ম শুভেন্দুর। তাঁর বাবা শিশির কুমার অধিকারী তিনবারের সংসদ সদস্য ছিলেন এবং কেন্দ্রীয় সরকারের পল্লী উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেছেন। বাবার দেখানো পথ ধরেই জনসেবায় ব্রতী হন শুভেন্দু। ১৯৯৫ সালে কাঁথি পৌরসভা থেকে জনপ্রতিনিধি হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবনের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। এরপর ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃণমূল কংগ্রেস প্রতিষ্ঠা করেন, তখন অধিকারী পরিবার সেই দলে যুক্ত হয়।
২০০৭ সালে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনে নন্দীগ্রামের জমি অধিগ্রহণবিরোধী আন্দোলন। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারের বিরুদ্ধে সাধারণ কৃষকদের অধিকার আদায়ের সেই উত্তাল আন্দোলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের অন্যতম প্রধান সেনাপতি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন শুভেন্দু। তবে সময়ের পরিক্রমায় রাজনৈতিক মতপার্থক্যের কারণে ২০২০ সালে তিনি তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে যোগ দেন।
পরবর্তীতে ২০২১ সালের নির্বাচনে নন্দীগ্রামের তীব্র উত্তেজনাপূর্ণ লড়াইয়ে খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে পরাজিত করে তিনি নিজের রাজনৈতিক শক্তির প্রমাণ দেন। আর গত ৪ মে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ নির্বাচনে তিনি কেবল নিজের আসন নন্দীগ্রামেই জেতেননি, বরং মমতার সবচেয়ে নিরাপদ রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত ‘ভবানীপুর’ আসন থেকেও বিশাল জয় তুলে নেন, যা গোটা ভারতের রাজনীতিতে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
পশ্চিমবঙ্গের এই ক্ষমতার পালাবদল কেবল ভারতের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতি, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং কূটনীতিতেও এর সরাসরি প্রভাব রয়েছে। দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় পর রাজ্যটিতে নতুন দলের সরকার এবং শুভেন্দু অধিকারীর মতো তৃণমূল পর্যায় থেকে উঠে আসা এক লড়াকু নেতার মুখ্যমন্ত্রীর আসনে বসা দুই দেশের সম্পর্কের সমীকরণে কী পরিবর্তন আনে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় কৌতূহলের বিষয়। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন চুক্তিসহ অমীমাংসিত বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুগুলো এই নতুন সরকারের আমলে আলোর মুখ দেখবে কি না, সচেতন মহলে এখন সেই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে। জি এম কাদেরের এই আগাম ও উষ্ণ শুভেচ্ছা বার্তা প্রমাণ করে যে, পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকরা পশ্চিমবঙ্গের নতুন নেতৃত্বের সঙ্গে দ্রুত একটি আস্থার সম্পর্ক গড়ে তুলতে চাইছেন, যা ভবিষ্যৎ জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ।