ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয়ভাবে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকা ব্যয়ের হিসাব নির্বাচন কমিশনে (ইসি) জমা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। মোট ব্যয়ের সিংহভাগই খরচ হয়েছে দলের প্রার্থীদের নির্বাচনি অনুদান হিসেবে। মঙ্গলবার (১২ মে) নির্বাচন ভবনে দলটির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এই আয়-ব্যয়ের বিবরণী তুলে ধরা হয়।
দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো ও নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, প্রতিটি নিবন্ধিত বা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলের জন্য নির্বাচন শেষ হওয়ার পর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে খরচের হিসাব নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা বাধ্যতামূলক। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশের (আরপিও) এই আইনি বাধ্যবাধকতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে মঙ্গলবার (১২ মে) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত নির্বাচন ভবনে এসে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আর্থিক হিসাব জমা দিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এহসানুল মাহবুব জুবায়ের নির্বাচন কমিশনের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদের দপ্তরে গিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে এই হিসাব বিবরণী হস্তান্তর করেন।
নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া জামায়াতের এই আর্থিক প্রতিবেদনে স্বাক্ষর করেছেন দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। কমিশনের কাছে হস্তান্তরিত ওই নথির তথ্য গভীরভাবে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, সদ্য সমাপ্ত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলটির কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে সর্বমোট ব্যয় হয়েছে ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার ৯৭২ টাকা।
হিসাব বিবরণী অনুযায়ী, দলীয় মোট খরচের সবচেয়ে বড় অংশটি সরাসরি প্রার্থীদের পেছনে ব্যয় করা হয়েছে। সারা দেশে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ২২৫ জন প্রার্থীকে দলীয় তহবিল থেকে আর্থিক সহায়তা বা অনুদান দেওয়া হয়েছে। কেবল এই একটি খাতেই দলটির মোট খরচ হয়েছে ৪ কোটি টাকা। প্রতিবেদন অনুযায়ী, দলের মনোনীত প্রতিটি প্রার্থী তাদের মাঠপর্যায়ের নির্বাচনি প্রচারণার সুবিধার্থে কেন্দ্রীয় তহবিল থেকে গড়ে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা করে পেয়েছেন।
প্রার্থীদের সরাসরি অনুদান দেওয়ার বাইরে অবশিষ্ট প্রায় ৪৯ লাখ ৪৭ হাজার টাকা খরচ হয়েছে দলের আনুষঙ্গিক, দাপ্তরিক ও প্রচারণামূলক বিভিন্ন কাজে। এর মধ্যে দলের নির্বাচনি ইশতেহার (যেখানে দেশ পরিচালনার ক্ষেত্রে দলের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও প্রতিশ্রুতি তুলে ধরা হয়) প্রস্তুত করা, এর অঙ্গসজ্জা বা নকশা তৈরি এবং ছাপানোর কাজ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এছাড়া দেশব্যাপী নিয়মিত সংবাদ সম্মেলন আয়োজন, সাংবাদিকদের আপ্যায়ন, নির্বাচনি প্রচার সামগ্রী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে পরিবহন এবং কেন্দ্রীয় নেতাদের দেশব্যাপী সফরের খরচও এই তালিকায় দেখানো হয়েছে। পাশাপাশি আইসিসিতে (তথ্য ও যোগাযোগ কেন্দ্র) দলের বিজ্ঞাপন প্রচারের পেছনেও নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ ব্যয় করেছে জামায়াতে ইসলামী।
খাতভিত্তিক ব্যয়ের আরও সুনির্দিষ্ট ও পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব নির্বাচন কমিশনে জমা দেওয়া নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে। ওই হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে সাধারণ নির্বাচনি প্রচারণার কাজে জামায়াতের ব্যয় হয়েছে ২০ লাখ ৯০ হাজার ৮২৭ টাকা। কেন্দ্রীয়ভাবে দলের পরিবহন খাতে খরচ দেখানো হয়েছে মাত্র ৮ হাজার ৭০০ টাকা। অন্যদিকে, দলের শীর্ষ নেতাদের দেশব্যাপী জনসভা আয়োজন ও সফর বাবদ খরচ হয়েছে ১৪ লাখ ১৭ হাজার ৫৯৯ টাকা।
নির্বাচনকালীন সময়ে প্রচারণার পাশাপাশি দাপ্তরিক কাজ পরিচালনার জন্য দলের কর্মীদের (কর্মচারী) বেতন ও ভাতা বাবদ ২ লাখ ৮৫ হাজার ৯০২ টাকা ব্যয় হয়েছে বলে জানানো হয়েছে। এছাড়া দেশজুড়ে আবাসন ও প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ৯ লাখ ৪৪ হাজার ৯৪৪ টাকা খরচ দেখিয়েছে দলটি। এসব সুনির্দিষ্ট খাতের বাইরে আনুষঙ্গিক আরও কিছু আকস্মিক খরচ মেটাতে বিবিধ খাত হিসেবে অতিরিক্ত ২ লাখ টাকার কথা হিসাব বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনি ব্যয়ের হিসাব জমা দেওয়ার এই আইনি প্রক্রিয়া দেশের নির্বাচনি ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী তাদের ব্যয়ের বিবরণী জমা দিয়ে আইনি বাধ্যবাধকতা পূরণ করেছে, যা নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে কাগজে-কলমে জমা দেওয়া হিসাব এবং মাঠপর্যায়ে প্রার্থীদের প্রকৃত খরচের মধ্যে প্রায়শই ব্যাপক ফারাক লক্ষ্য করা যায়। যেমন, একটি জাতীয় নির্বাচনে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিবহন খাতে মাত্র আট হাজার টাকার মতো খরচ সাধারণ পাঠকের মনে যৌক্তিক কৌতূহল জাগাতে পারে। রাজনৈতিক দলগুলোর এই আর্থিক জবাবদিহি কেবল কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি দেশে একটি সত্যিকারের স্বচ্ছ রাজনৈতিক ও নির্বাচনি সংস্কৃতি গড়ে উঠবে—তা নির্ভর করছে নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষ নিরীক্ষা, স্বাধীন তদন্ত ও কঠোর নজরদারির ওপর। সাধারণ মানুষ আশা করে, নির্বাচন কমিশন শুধু হিসাব গ্রহণ করেই দায়িত্ব শেষ করবে না, বরং প্রয়োজনে এই হিসাবগুলোর সত্যতাও যাচাই করবে।