প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান স্পষ্ট হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেছেন, দেশের সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তা ও শান্তি বিনষ্ট করে কোনো ধরনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি বা হরতাল পালন করতে দেওয়া হবে না। তিনি অতীতের দীর্ঘমেয়াদী রাজনৈতিক অচলাবস্থার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, ১৭৩ দিন হরতাল করার মতো জনবিরোধী সুযোগ আর কাউকে দেওয়া হবে না।
সোমবার বিকেলে যশোর ঈদগাহ ময়দানে জেলা বিএনপি আয়োজিত এক বিশাল জনসভায় প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। দীর্ঘ প্রতীক্ষিত এই জনসভাকে কেন্দ্র করে যশোর ও আশপাশের জেলাগুলো থেকে আসা মানুষের ঢল নামে। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রধানমন্ত্রী তার সরকারের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা এবং বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন।
সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতাদের প্রতি পরোক্ষ ইঙ্গিত করে তারেক রহমান বলেন, যারা বিএনপিকে ফ্যাসিবাদের দোসর বলে অপবাদ দিচ্ছে, মূলত তারাই পর্দার আড়ালে ফ্যাসিবাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, যারা ঢাকার বাইরে গোপনে স্বৈরাচারের প্রতিনিধিদের সঙ্গে মিটিং করে, তারা কখনোই জনগণের বন্ধু হতে পারে না। ১৯৭১ কিংবা ২০০৮ সালে যারা জাতিকে বিভ্রান্ত করেছিল, ২০২৬ সালেও সেই একই চক্র অপচেষ্টা চালাচ্ছে। দেশবাসীকে এই ষড়যন্ত্রকারীদের বিষয়ে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
উন্নয়ন পরিকল্পনার কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকারি সুবিধা এখন সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। ‘পারিবারিক কার্ড’ (ফ্যামিলি কার্ড) বা বিশেষ সুবিধাভোগী পরিচয়পত্রের সংখ্যা পর্যায়ক্রমে কয়েক কোটি মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার ঘোষণা দেন তিনি। এছাড়া দেশের বন্ধ হয়ে যাওয়া কল-কারখানাগুলো আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পুনরায় সচল করার মাধ্যমে ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টির প্রতিশ্রুতি দেন।
নারী উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বড় দুটি ঘোষণা দেন। তিনি জানান, এখন থেকে মেয়েদের স্নাতক (ডিগ্রি) পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হবে। পাশাপাশি মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত নারীদের রান্নার ব্যয় ও কষ্ট লাঘবে সরকারিভাবে ‘এলপিজি কার্ড’ (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস কার্ড) প্রদান করা হবে। তার মতে, দেশের মোট জনসংখ্যার অর্ধেক যে নারী সমাজ, তাদের পেছনে ফেলে প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
তারেক রহমান তার বক্তব্যে আরও উল্লেখ করেন যে, জুলাই সনদ (বিশেষ রাজনৈতিক ইশতেহার) বাস্তবায়নে দেশের মানুষ ‘হ্যাঁ-না’ ভোটের মাধ্যমে পূর্ণ সমর্থন দিয়েছে এবং বর্তমান সরকার সেই লক্ষ্যেই কাজ করছে। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এবং বেগম খালেদা জিয়ার অসমাপ্ত জনকল্যাণমূলক কাজগুলো সম্পন্ন করাই তার সরকারের মূল লক্ষ্য। বৈদেশিক কর্মসংস্থানের বিষয়ে তিনি বলেন, যেসব দেশে জনশক্তি রপ্তানি বর্তমানে সীমিত বা বন্ধ আছে, সেই সব দেশের সাথে আলোচনা চলছে এবং দ্রুতই সেখানে আবার কর্মী পাঠানো শুরু হবে।
যশোর জেলা বিএনপির সভাপতি সৈয়দ সাবেরুল হক সাবুর সভাপতিত্বে সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন বিএনপির কেন্দ্রীয় ভাইস চেয়ারম্যান নার্গিস বেগম, স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, পানিসম্পদ মন্ত্রী শহীদ উদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিতসহ কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। এর আগে সকালে প্রধানমন্ত্রী শার্শা উপজেলার উলাশীতে দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনে একটি খাল পুনঃখনন প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই যশোর সফর এবং সেখানে দেওয়া ঘোষণাগুলো তৃণমূল পর্যায়ে কর্মসংস্থান ও নারী শিক্ষার প্রসারে বড় ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে। বিশেষ করে হরতাল-অবরোধের মতো কর্মসূচি প্রতিহত করার ঘোষণাটি ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি যোগালেও, রাজনৈতিক অঙ্গনে এটি নতুন কোনো মেরুকরণ তৈরি করে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। উন্নয়ন ও স্থিতিশীলতার যে বার্তা সরকার দিতে চাইছে, তা কতটা কার্যকর হয় তার ওপরই নির্ভর করছে ২০২৬ সালের পরবর্তী রাজনৈতিক পথচলা।