দেশের আগামী সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ অংশ নিতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন। সম্প্রতি একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে দেওয়া বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি শেখ হাসিনাকে ফিরিয়ে আনা, নিজের পদত্যাগের ইচ্ছা এবং পররাষ্ট্রনীতিসহ বিভিন্ন বিষয়ে খোলামেলা কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এম তৌহিদ হোসেন দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজের বিশ্লেষণ তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, আওয়ামী লীগ দেশের রাজনীতি থেকে সম্পূর্ণভাবে হারিয়ে যায়নি এবং হারিয়ে যাবেও না। এ প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, সাধারণ মানুষের স্মৃতিশক্তি সাধারণত খুব দীর্ঘস্থায়ী হয় না। পুরোনো স্মৃতি ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতার কারণেই আওয়ামী লীগ আবারও মূলধারার রাজনীতিতে ফিরে আসতে পারে। তিনি নিজস্ব অনুমান প্রকাশ করে বলেন, দলটি হয়তো আগামী সংসদ নির্বাচনেই অংশ নেবে।
আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনাকে ভারত থেকে ফিরিয়ে আনার জন্য দিল্লির কাছে পাঠানো চিঠির বিষয়েও অত্যন্ত স্পষ্ট কথা বলেছেন সাবেক এই উপদেষ্টা। তিনি জানান, শেখ হাসিনাকে ফেরত চেয়ে দিল্লিকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দেওয়া হলেও সেটির কোনো ইতিবাচক উত্তর আসবে না—তা তিনি আগে থেকেই জানতেন। চিঠি পাঠানোর পর কোনো প্রতিক্রিয়া বা উত্তর না আসার বিষয়ে তৌহিদ হোসেন বলেন, তিনি ব্যক্তিগতভাবে ভারত সরকারের কাছ থেকে কোনো উত্তর আশা করেননি। কূটনীতিক দৃষ্টিকোণ থেকে এই প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করা হলেও এর কার্যকারিতা নিয়ে তাঁর মনে পূর্ব থেকেই সংশয় ছিল।
অন্তর্বর্তী সরকারে নিজের দায়িত্ব পালনকালীন সময়ের কিছু অজানা তথ্যও এই সাক্ষাৎকারে প্রকাশ করেন সাবেক এই কূটনৈতিক। তিনি জানান, উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় তিনি অন্তত তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সরকারের অন্যান্য নীতিনির্ধারকদের অনুরোধে তাঁকে সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে হয়। সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে জানানো হয়েছিল যে, এই পরিস্থিতিতে তাঁর পদত্যাগ অন্তর্বর্তী সরকারের জন্য অত্যন্ত বিব্রতকর পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। মূলত সরকারের ভাবমূর্তি ও স্থিতিশীলতার কথা চিন্তা করেই তিনি শেষ পর্যন্ত নিজের দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সাম্প্রতিক বাণিজ্য চুক্তির বিষয়ে সরকারের ভেতরের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দেন তৌহিদ হোসেন। জাতীয় নির্বাচনের মাত্র তিন দিন আগে অন্তর্বর্তী সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে এই বাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করে। এই চুক্তির পেছনে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কোনো ভূমিকা ছিল কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে সাবেক উপদেষ্টা সাফ জানিয়ে দেন, এই চুক্তি প্রক্রিয়ার সাথে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামান্যতম কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। পুরো বিষয়টি মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার কার্যালয় থেকে সরাসরি তদারকি ও সম্পাদন করা হয়েছে।
এছাড়াও, গত জুলাই মাসের গণঅভ্যুত্থানে ‘ডিপ স্টেট’ বা নিভৃত রাষ্ট্রশক্তির (রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে অবস্থানকারী কোনো অদৃশ্য প্রভাবশালী গোষ্ঠী যারা নীতিনির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করে) কোনো ভূমিকা ছিল কি না, তা নিয়ে কথা বলেন এম তৌহিদ হোসেন। তিনি বিশ্ব রাজনীতির বাস্তবতার নিরিখে মন্তব্য করেন যে, পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি বড় রাজনৈতিক ও সামাজিক ঘটনার পেছনেই কোনো না কোনোভাবে এই অদৃশ্য রাষ্ট্রশক্তির সম্পৃক্ততা থাকে। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হওয়ার সুযোগ কম বলে তিনি মনে করেন।
সাবেক পররাষ্ট্র উপদেষ্টার এই বক্তব্য দেশের বর্তমান রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি ও অন্তর্বর্তী সরকারের অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের অভাবকে ইঙ্গিত করে। শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের চিঠি নিয়ে তাঁর বাস্তববাদী মন্তব্য এবং আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনের পূর্বাভাস দেশের রাজনীতিতে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। একটি দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য সব পক্ষের অংশগ্রহণ যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি অতীতের কর্মকাণ্ডের জবাবদিহি নিশ্চিত করাও সমান জরুরি। জনগণের ক্ষণস্থায়ী স্মৃতিশক্তি ও রাজনৈতিক দলগুলোর পুনর্বাসনের এই জটিল রসায়ন আগামী দিনে বাংলাদেশের রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যায়, সেটিই এখন বড় ভাবনার বিষয়।