ঈদুল আজহা উপলক্ষে নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা মানুষের পকেট কেটে চলছে গণপরিবহনের রমরমা বাণিজ্য। অতিরিক্ত ভাড়া না নেওয়ার বিষয়ে বাস মালিকদের দেওয়া প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কোনো কাজেই আসেনি, বরং নগর পরিবহন থেকে শুরু করে দূরপাল্লার বাসে চলছে চরম নৈরাজ্য। সম্প্রতি বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির এক চাঞ্চল্যকর পর্যবেক্ষণে সাধারণ যাত্রীদের এই অসহায়ত্বের চিত্র ফুটে উঠেছে।
উৎসবের আনন্দ প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগাভাগি করে নিতে প্রতিবারের মতোই এবারও রাজধানী ছাড়ছে লাখো মানুষ। কিন্তু এই ঈদযাত্রাকে কেন্দ্র করে সড়কপথে যে ভাড়ার নৈরাজ্য শুরু হয়েছে, তা সাধারণ যাত্রীদের জন্য রীতিমতো ‘মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বুধবার (২৭ মে) সংবাদমাধ্যমে পাঠানো এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী পরিবহন খাতের এই নৈরাজ্যের বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরেন।
সংগঠনটির গভীর পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে যে, এবারের ঈদযাত্রার আগে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির পক্ষ থেকে যাত্রীদের আশ্বস্ত করা হয়েছিল, কোনোভাবেই নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হবে না। কিন্তু মাঠপর্যায়ের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। মালিকদের সেই প্রতিশ্রুতি চরমভাবে উপেক্ষিত হচ্ছে। নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে প্রায় প্রতিটি সড়কেই যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। অন্যদিকে পরিবহন শ্রমিকদের দাবি, উৎসবের এই সময়েও তাদের জন্য কোনো নির্দিষ্ট বেতন বা ঈদ উৎসব ভাতার (বোনাস) ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়েই তারা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নিচ্ছেন।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে এই নৈরাজ্যের ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট হয়। যাত্রী কল্যাণ সমিতির তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে দূরপাল্লার প্রায় সাড়ে আটশ যাতায়াতের পথের মধ্যে মাত্র ২৭টি পথ পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬টি পথেই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের প্রমাণ মিলেছে। এই নির্দিষ্ট পথগুলোতে যাতায়াতকারী প্রায় ২ লাখ ৩৪ হাজার সাধারণ যাত্রীর কাছ থেকে অতিরিক্ত হিসেবে আদায় করা হয়েছে ৫ কোটি ৬১ লাখ ৯৩ হাজার টাকা।
সমিতির হিসাবে, এবারের ঈদে ঢাকা থেকে প্রায় ৯৫ লাখ মানুষ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যাতায়াত করছেন। এর পাশাপাশি এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত করবেন আরও প্রায় তিন কোটি যাত্রী। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের বাড়ি ফেরার ব্যাকুলতার সুযোগ নিয়েই চলছে ভাড়ার নামে প্রকাশ্য চাঁদাবাজি।
নির্দিষ্ট কিছু পথের ভাড়ার তালিকা পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ঢাকা থেকে খুলনার নির্ধারিত ভাড়া ৫৪১ টাকা হলেও আদায় করা হচ্ছে ১ হাজার টাকা। ঢাকা-বরিশাল পথে ৫৯২ টাকার ভাড়ার বদলে নেওয়া হচ্ছে ৮৫০ টাকা। এমনকি সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআরটিসি) দোতলা বাসেও এই পথে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি, অর্থাৎ ৭০০ টাকা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ঢাকা-পটুয়াখালী পথে ৫৭০ টাকার বদলে ১ হাজার টাকা, ঢাকা-শরীয়তপুর পথে ২৩৩ টাকার বদলে ৫০০ টাকা, চট্টগ্রাম-বরগুনা পথে ১ হাজার ১৯৭ টাকার বদলে ১ হাজার ৮০০ টাকা এবং ঢাকা-মাদারীপুর পথে ২৫০ টাকার ভাড়া ৫০০ টাকা নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এর বাইরেও ঢাকা থেকে গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, যশোর, শিবচর, ঝালকাঠি, ঝিনাইদহ, মাগুরা, কুষ্টিয়া, দিনাজপুর, ফেনী, কুমিল্লা, টেকেরহাট এবং পিরোজপুরসহ বিভিন্ন গন্তব্যের বাসে নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বহুগুণ বেশি অর্থ আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।
প্রতারণা শুধু অতিরিক্ত ভাড়াতেই সীমাবদ্ধ নেই। পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ৫২ আসনের বাসে জালিয়াতির মাধ্যমে ৪০ আসনের ভাড়ার তালিকা টানিয়ে রাখা হয়েছে, যাতে জনপ্রতি বেশি ভাড়া নেওয়া যায়। পাশাপাশি স্বল্প দূরত্বের যাত্রীদের কাছ থেকেও জোরপূর্বক বাসের শেষ গন্তব্যের সম্পূর্ণ ভাড়া আদায় করার মতো অমানবিক ঘটনা অহরহ ঘটছে।
যাত্রী কল্যাণ সমিতি তাদের প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করেছে যে, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের এই অরাজকতার কারণে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্যবৃদ্ধি পাচ্ছে, পরিবহনে চাঁদাবাজি বাড়ছে এবং সমাজে চরম অস্থিরতা তৈরি হচ্ছে। সবচেয়ে মর্মান্তিক বিষয় হলো, ভাড়ার এই ঊর্ধ্বগতির কারণে নিম্নআয়ের খেটে খাওয়া মানুষ বাধ্য হয়ে বাস ও ট্রেনের ছাদে কিংবা পণ্যবাহী ট্রাকে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যাতায়াত করছেন। এর ফলে অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।
পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সংগঠনটি বেশ কয়েকটি যুগান্তকারী সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—গণপরিবহনে প্রযুক্তিনির্ভর বা নগদ অর্থহীন ভাড়া আদায় পদ্ধতি চালু করা, চালক ও সহকারীদের মাসিক বেতন ও ঈদ উৎসব ভাতা নিশ্চিত করা, মহাসড়কে নিরাপত্তা ক্যামেরার (ক্লোজড সার্কিট ক্যামেরা) মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা বা জরিমানার ব্যবস্থা করা এবং ঈদযাত্রা তদারকি কমিটিকে সরাসরি সরকারের পূর্ণাঙ্গ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা।
প্রতি বছরই ঈদের আগে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিরুদ্ধে নানা মহলে হাঁকডাক শোনা যায়, কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় না। মালিক সমিতির প্রতিশ্রুতি যে কেবল লোকদেখানো, তা এবারের চিত্রেই আবারও প্রমাণিত হলো। সাধারণ মানুষের পকেট কেটে পরিবহন খাতের এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর পকেট ভারী করার এই সংস্কৃতি একদিনে গড়ে ওঠেনি। সরকারি তদারকির চরম অভাব এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হওয়াই এর মূল কারণ। অন্যদিকে, পরিবহন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা না দেওয়ার অজুহাত কোনোভাবেই যাত্রীদের জিম্মি করার বৈধতা দিতে পারে না। সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত কেবল আশ্বাস না দিয়ে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা। পরিবহন খাতকে একটি নিয়মতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যে আনতে না পারলে সাধারণ মানুষের কাছে ঈদযাত্রা চিরকাল এক আতঙ্কের নাম হয়েই থাকবে।