নাড়ির টানে বাড়ি ফেরা হলো না তাদের, প্রিয়জনের সাথে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে গিয়ে উল্টো মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন ১৫ জন যাত্রী। সোমবার ভোরে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে যাত্রীবোস্টন করা একটি রডবোঝাই মালবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে গেলে মহাসড়কে এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটে।
উৎসবের আনন্দ মুহূর্তেই রূপ নিলো এক ভয়াল বিষাদে। দীর্ঘ ছুটির অপেক্ষায় থাকা পরিবারগুলোর কাছে পৌঁছাল আপনজনের মৃত্যুর হিমশীতল খবর। ঈদ উপলক্ষে রাজধানী থেকে উত্তরবঙ্গের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন একদল মানুষ। কিন্তু পথিমধ্যেই ঘটল মর্মান্তিক এক দুর্ঘটনা। সোমবার ভোররাত আনুমানিক ৪টার দিকে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার সরাতৈল এলাকায় একটি রডবোঝাই ভারী মালবাহী গাড়ি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে যায়। এই ভয়াবহ দুর্ঘটনায় ঘটনাস্থলেই অন্তত ১৫ জন নিহত হন। পাশাপাশি আহত হয়েছেন আরও অন্তত দশজন সাধারণ যাত্রী।
ঈদের সময় মহাসড়কে যানবাহনের তীব্র সংকট এবং ভাড়ার আধিক্যের কারণে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ প্রায়ই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে এমন মালবাহী গাড়িতে যাতায়াত করেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর (পুলিশ) প্রাথমিক তদন্ত ও উদ্ধারকর্মীদের ভাষ্যমতে, দুর্ঘটনাকবলিত গাড়িটি মূলত নির্মাণকাজের ভারী রড বহন করছিল। কিন্তু চালক এবং তার সহকারী অতিরিক্ত ভাড়ার লোভে বিভিন্ন স্থান থেকে সাধারণ যাত্রীদের সেই গাড়িতে তুলে নেন। যাত্রীদের রডের ওপর বসিয়ে তার ওপরে মোটা আচ্ছাদন (ত্রিপল—বৃষ্টি বা রোদ থেকে বাঁচাতে ব্যবহৃত পলিথিন বা কাপড়ের মোটা পর্দা) টেনে দেওয়া হয়েছিল, যাতে বাইরে থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের দেখতে না পান।
ভোররাতের দিকে মহাসড়ক অনেকটাই ফাঁকা থাকে। ধারণা করা হচ্ছে, ফাঁকা রাস্তায় অতিরিক্ত দ্রুতগতিতে গাড়ি চালানোর কারণে অথবা শেষরাতের দিকে চালক তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে পড়ার ফলে কালিহাতীর সরাতৈল এলাকায় এসে গাড়িটি হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারায়। মুহূর্তের মধ্যেই ভারী গাড়িটি মহাসড়কের ওপর সজোরে ছিটকে উল্টে যায়। এ সময় আচ্ছাদনের নিচে থাকা যাত্রীরা ভারী রড এবং গাড়ির বিশাল চাকার নিচে চাপা পড়েন। ঘুমন্ত অবস্থায় থাকা এই হতভাগ্য যাত্রীরা নিজেদের রক্ষার বা পালানোর কোনো সুযোগই পাননি। ঘটনাস্থলেই পিষ্ট হয়ে ১৫ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে দ্রুত সেখানে পৌঁছায় স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং অগ্নিনির্বাপণ ও উদ্ধারকারী দলের (ফায়ার সার্ভিস) সদস্যরা। তারা স্থানীয় সাধারণ মানুষের সহায়তায় হতাহতদের উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়েন। টাঙ্গাইল জেলার প্রধান পুলিশ কর্মকর্তা (পুলিশ সুপার) মুহাম্মদ শামছুল আলম সরকার সংবাদমাধ্যমের কাছে এই দুর্ঘটনার ভয়াবহতা সম্পর্কে নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, ঢাকা ও আশপাশের বিভিন্ন জায়গা থেকে ওই রডবোঝাই গাড়িতে যাত্রীদের তোলা হয়েছিল। দুর্ঘটনার পর পরই পুরো এলাকা জুড়ে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা রড এবং আচ্ছাদনের নিচ থেকে অনেক কষ্টে মৃতদেহগুলো বের করে আনেন উদ্ধারকর্মীরা।
আহতদের অত্যন্ত আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে টাঙ্গাইল সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্রে (জেনারেল হাসপাতাল) পাঠানো হয়েছে। বর্তমানে সেখানে তাদের নিবিড় চিকিৎসা চলছে। আহতদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা অত্যন্ত গুরুতর হওয়ায় নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দায়িত্বরত চিকিৎসকরা। অন্যদিকে নিহতদের মৃতদেহগুলো ময়নাতদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার জন্য একই চিকিৎসাকেন্দ্রের লাশঘরে (মর্গ) রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনার আকস্মিকতা এবং নিহতদের কাছে কোনো পরিচয়পত্র না থাকায় তাৎক্ষণিকভাবে তাদের নাম ও বিস্তারিত পরিচয় জানা সম্ভব হয়নি।
টাঙ্গাইল সাধারণ চিকিৎসাকেন্দ্রের লাশঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (মর্গ ইনচার্জ) গোপাল গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, "আমরা এখন পর্যন্ত দুর্ঘটনার শিকার ১৫ জনের মৃতদেহ গ্রহণ করেছি।" নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও আঙুলের ছাপ বিশেষজ্ঞরা কাজ করে যাচ্ছেন। পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃতদেহগুলো তাদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।
প্রতি বছরই ঈদযাত্রায় এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনার খবর আমাদের সংবাদপত্রের পাতা দখল করে। যানবাহনের চরম অভাব এবং অতিরিক্ত ভাড়ার কারণে জীবনের ঝুঁকি জেনেও দরিদ্র মানুষ মালবাহী গাড়িতে উঠতে বাধ্য হন। মালবাহী গাড়িতে যাত্রী পরিবহনে কঠোর আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ কতটুকু, এই দুর্ঘটনাই তার সবচেয়ে বড় এবং মর্মান্তিক প্রমাণ। মহাসড়কে নজরদারি ফাঁকি দিয়ে কীভাবে একটি রডবোঝাই গাড়ি এতগুলো মানুষ নিয়ে মাইলের পর মাইল পাড়ি দিল, তা প্রশাসনের দায়িত্বশীলতা নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন তোলে। ঈদযাত্রায় সাধারণ মানুষের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে শুধু আইন করলেই হবে না, বরং সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধি এবং সুলভ মূল্যের গণপরিবহন ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে উৎসবের এই মৃত্যুমিছিল কখনোই থামানো যাবে না।