পবিত্র ঈদুল আজহার সরকারি ছুটি শুরুর প্রথম দিনেই রাজধানীর সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। রোববার সকাল থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন জেলাগামী যাত্রীরা পরিবার-পরিজন নিয়ে নদী বন্দরে জড়ো হতে থাকেন। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভিড় আরও বাড়বে বলে ধারণা করছেন নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
রোববার সকালে সদরঘাট টার্মিনাল ঘুরে দেখা যায় উৎসবমুখর ও ব্যস্ত এক চিত্র। নদী বন্দরের পন্টুনগুলোতে (লঞ্চ ভেড়ানোর ভাসমান জেটি) যাত্রীদের কোলাহল। কারও হাতে ভ্রমণের ব্যাগ, কেউবা মাথায় মালপত্র নিয়ে লঞ্চের দিকে ছুটে চলছেন। ভিড়ের মধ্যে শিশুদের হাত শক্ত করে ধরে রেখেছেন অভিভাবকরা। অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে অনেকেই নির্ধারিত সময়ের বেশ আগেই পরিবারের সদস্যদের নিয়ে লঞ্চের ডেকে আসন গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে বরিশাল, ভোলা, পটুয়াখালী ও চাঁদপুরগামী লঞ্চের পন্টুনগুলোতে মানুষের উপস্থিতি ছিল সবচেয়ে বেশি। কিছুক্ষণ পরপর লঞ্চের সাইরেন ও মাইকের ঘোষণা সদরঘাট এলাকাকে মুখরিত করে রাখছে।
সাম্প্রতিক সময়ে বুড়িগঙ্গা নদীর পানির স্তর বৃদ্ধি পাওয়ায় পন্টুনগুলো আগের তুলনায় কিছুটা উঁচুতে অবস্থান করছে। ফলে যাত্রীদের লঞ্চে ওঠানামা করতে বিগত বছরগুলোর তুলনায় কম বেগ পেতে হচ্ছে। বরিশালগামী যাত্রী মনিরুল হোসেন জানান, ছুটির প্রথম দিন হওয়ায় সকালে কিছুটা স্বস্তিতে লঞ্চে উঠতে পেরেছেন। তবে দুপুরের পর এই ভিড় কয়েক গুণ বাড়বে বলে তিনি মনে করেন। অন্য এক যাত্রী শাহিনা আক্তার বলেন, শেষ মুহূর্তের ভোগান্তি এড়াতে শিশুদের নিয়ে আগেই রওনা দিয়েছেন। নদীপথের যাত্রা আরামদায়ক হলেও অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই এবং বাড়তি ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিয়ে সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে এখনও এক ধরনের আশঙ্কা কাজ করছে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) সূত্রে জানা গেছে, এবারের ঈদে নদীপথে আনুমানিক ১০ থেকে ১২ লাখ যাত্রী যাতায়াত করতে পারেন। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের যাতায়াত নির্বিঘ্ন করতে প্রায় পৌনে দুইশত (১৭৫টি) নৌযান প্রস্তুত রাখা হয়েছে। যাত্রীদের অতিরিক্ত চাপ সামাল দিতে প্রয়োজন অনুযায়ী বিশেষ নৌযান বা বিশেষ সার্ভিস চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে কর্তৃপক্ষের। ঢাকা নদীবন্দরের নৌ-নিরাপত্তা ও ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা বিভাগের যুগ্ম পরিচালক মুহম্মদ মোবারক হোসেন জানিয়েছেন, যাত্রীদের নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক যাতায়াত নিশ্চিত করতে বন্দর এলাকায় ২৪ ঘণ্টা নজরদারি ব্যবস্থা সচল রাখা হয়েছে। বিশেষ করে আগামী কয়েক দিন বিকেল ও রাতে যাত্রীদের ভিড় সবচেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
নৌপথের ঈদযাত্রাকে নিরাপদ করতে মে মাসের শেষ সপ্তাহ থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত সদরঘাট ও তার আশেপাশের নদীপথে বিশেষ নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব), নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড, ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি) এবং আনসার সদস্যরা যৌথভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। টার্মিনালের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টে অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প স্থাপন করা হয়েছে। পকেটমার, অজ্ঞান পার্টি ও মলম পার্টির মতো অপরাধী চক্রের তৎপরতা বন্ধে সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে বলে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে।
নৌযান মালিকপক্ষও এবারের ঈদে যাত্রী নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন। পারাবত-৮ লঞ্চের পরিচালক মো. কামাল হোসেন জানান, ঈদযাত্রার আগে প্রতিটি লঞ্চের কারিগরি যোগ্যতা, জীবনরক্ষাকারী জ্যাকেট (লাইফ জ্যাকেট) এবং অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা হয়েছে। যাত্রীদের আরামদায়ক ভ্রমণ নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। তবে শেষ মুহূর্তে তাড়াহুড়ো করে অতিরিক্ত যাত্রী হয়ে লঞ্চে না ওঠার জন্য তিনি সাধারণ মানুষের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন।
নদীপথে ঈদযাত্রা সবসময়ই বাঙালি সংস্কৃতির এক চিরন্তন উৎসবমুখর রূপ প্রকাশ করে। তবে এই উৎসব যেন কোনোভাবেই বিপদে পরিণত না হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন ও সাধারণ যাত্রী উভয়েরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাই প্রতিরোধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে কঠোর ও আপসহীন নীতি বজায় রাখতে হবে। একই সাথে, যাত্রী সাধারণকেও নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অতিরিক্ত বোঝাই নৌযানে চড়া থেকে বিরত থাকতে হবে। নিয়মশৃঙ্খলা বজায় রাখলে এবং প্রশাসনের সঠিক তদারকি থাকলে এবারের ঈদযাত্রা সত্যিই নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক হতে পারে।