রাজধানী ঢাকাকে যানজটমুক্ত ও চলাচলের উপযোগী করতে ফুটপাত ও রাস্তা হকারমুক্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন। মানবিক বিবেচনায় কোরবানির ঈদ পর্যন্ত সময় দেওয়া হলেও, এরপর আর কোনো ছাড় দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দিয়েছে সংস্থাটি।
দীর্ঘদিন ধরে রাজধানীর প্রধান সড়ক ও ফুটপাত দখলের ফলে পথচারীদের চলাচল চরম ভোগান্তির শিকার হয়ে আসছে। এই সংকট সমাধানে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এবার কঠোর পথ বেছে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। বুধবার (২০ মে) সংস্থার পক্ষ থেকে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জানানো হয়, আসন্ন কোরবানির ঈদের পর থেকে ফুটপাত ও রাস্তায় হকার বসানো সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হবে। যারা এতদিন বিভিন্ন জায়গায় ব্যবসা চালিয়ে আসছেন, তাদের নির্ধারিত স্থানে সরে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে, মানবিক কারণে হকারদের জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে এই সময়টুকু দেওয়া হয়েছে। তবে ঈদের ছুটির পর যদি কেউ ফুটপাত বা প্রধান সড়কে অস্থায়ী দোকান নিয়ে বসে, তবে তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের চলাচলের পথ রুদ্ধ হতে দেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে ডিএনসিসি।
এদিকে, কর্তৃপক্ষের এই ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নগরবাসীর মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। অনেক নগরবাসী ফুটপাত দখলমুক্ত করার উদ্যোগকে স্বাগত জানালেও, হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। বাড্ডা এলাকার বাসিন্দা ফেরদৌস আহমেদ বলেন, শহরের শৃঙ্খলা ফেরাতে ফুটপাত অবশ্যই দখলমুক্ত করতে হবে। কিন্তু হকারদের বিকল্প কোনো আয়ের ব্যবস্থা বা নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ না করে শুধু উচ্ছেদ করলে তারা আবারও ফুটপাতে ফিরে আসতে বাধ্য হবে। তাই উন্নত বিশ্বের আদলে হকারদের জন্য একটি স্থায়ী ও সুনির্দিষ্ট কর্মসংস্থান বা স্থান নির্ধারণ করা সময়ের দাবি।
মূলত, অধিকাংশ নগরবাসীর অভিমত হলো—কেবল উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে দীর্ঘমেয়াদী সমাধান পাওয়া সম্ভব নয়। অতীতেও একাধিকবার এমন উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, কিন্তু হকারদের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের অভাবে পরিস্থিতি বারবার আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। হকারদের একটি শৃঙ্খলার মধ্যে এনে নির্দিষ্ট স্থানে ব্যবসার সুযোগ করে দিলে একদিকে যেমন রাস্তা ও ফুটপাত মুক্ত থাকবে, অন্যদিকে প্রান্তিক ব্যবসায়ীরাও জীবিকা অর্জনের পথ খুঁজে পাবেন।
সিটি করপোরেশনের এমন কঠোর বার্তার পর এখন দেখার বিষয়, ঈদের পর তারা কতটা দৃঢ়ভাবে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে। একইসাথে, হকারদের পুনর্বাসনের বিষয়ে সংস্থাটি কতটা কার্যকর ও স্থায়ী পরিকল্পনা গ্রহণ করে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে। নগরবাসী মনে করেন, ঢাকা যদি আসলেই বাসযোগ্য ও যানজটমুক্ত শহর হিসেবে গড়ে তুলতে হয়, তবে হকার উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন—এই দুই কাজই সমানতালে এগিয়ে নিতে হবে।
ফুটপাত পথচারীদের, এটি একটি মৌলিক অধিকার। কিন্তু বাস্তবতা হলো, আমাদের শহরের একটি বড় জনগোষ্ঠীর জীবিকা এই ফুটপাতকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের এই কঠোর অবস্থান শৃঙ্খলার স্বার্থে জরুরি হলেও, কেবল উচ্ছেদ দিয়ে সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। কর্তৃপক্ষকে মনে রাখতে হবে, হকাররা অনেকটা নিরুপায় হয়েই ফুটপাতে বসেন। তাই তাদের জন্য সিটি করপোরেশন কর্তৃক নির্ধারিত স্থানগুলো যেন ব্যবসায়িকভাবে লাভজনক ও ক্রেতা সাধারণের জন্য সহজগম্য হয়, সেটি নিশ্চিত করা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রশাসনের কঠোরতার পাশাপাশি মানবিক পুনর্বাসন নীতিমালা বাস্তবায়িত হলেই কেবল ঢাকা সত্যিকারের একটি শৃঙ্খল নগরীতে পরিণত হতে পারবে।