আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে নৌপথে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নিরাপদ, আরামদায়ক ও বিশৃঙ্খলাহীন করার লক্ষ্যে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। সদরঘাটসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দরগুলোতে এবার নেওয়া হয়েছে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা, যার আওতায় মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার এবং অনিয়ম রোধে বিশেষ নজরদারি চালানো হবে।
ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষ প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদ করতে গ্রামে ফেরেন। এ সময় নৌপথে যাত্রীদের ভিড় সামাল দেওয়া ও দুর্ঘটনা এড়ানো প্রশাসনের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে উচ্চপর্যায়ের একটি সভায় বেশ কিছু সমন্বিত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম এবং প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসানের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত এই সভায় যাত্রীসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে একযোগে কাজ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
যাত্রী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এবার নৌপথে শৃঙ্খলা ফেরাতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ কিছু পদক্ষেপ। এর মধ্যে অন্যতম হলো, সদরঘাটে বিভিন্ন সংস্থার আলাদা কন্ট্রোল রুমের পরিবর্তে একটি ‘কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ’ স্থাপন করা, যা বিআইডব্লিউটিএ, নৌপুলিশ, কোস্টগার্ড এবং ফায়ার সার্ভিসের সমন্বয়ে পরিচালিত হবে। লঞ্চগুলোতে নিরাপত্তা জোরদারে ১৯ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত প্রতিটি লঞ্চে অন্তত চারজন আনসার সদস্য মোতায়েন থাকবে। তারা লঞ্চে অতিরিক্ত যাত্রী তোলা, ছাদে যাত্রী বসানো কিংবা যত্রতত্র মালামাল বহনের মতো অনিয়ম ঠেকাতে সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করবেন।
নৌদুর্ঘটনা রোধে আরও কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ঈদের আগে ও পরে মোট ১০ দিন অর্থাৎ ২৩ মে থেকে ২ জুন পর্যন্ত সারাদেশে বালুবাহী বাল্কহেড চলাচল সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে। পাশাপাশি সদরঘাট থেকে ডিঙ্গি নৌকা চলাচলও বন্ধ থাকবে। নদীর মাঝপথে ট্রলার বা নৌকা ভিড়িয়ে যাত্রী ওঠানামা করা এবার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে; এটি অমান্য করলে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যাত্রীচাপ সামলাতে এবার সদরঘাটের পাশাপাশি মোহাম্মদপুরের বসিলা এবং পূর্বাচলের কাঞ্চন ব্রিজসংলগ্ন শিমুলিয়া ঘাট থেকে লঞ্চ পরিচালনার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এসব ঘাটে বিআরটিসির শাটল বাস সেবা, বিশুদ্ধ পানি, বিশ্রামাগার এবং হুইলচেয়ারের মতো সুবিধা থাকবে। সদরঘাট থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত এলাকাটি হকার ও যানজটমুক্ত রাখতে ঢাকা মহানগর পুলিশ ও সিটি করপোরেশনকে বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভাড়া নৈরাজ্য বন্ধে মন্ত্রণালয় কঠোর অবস্থানে রয়েছে। সব লঞ্চে অনুমোদিত ভাড়ার তালিকা প্রদর্শনের পাশাপাশি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এমনকি মালিক সমিতিকে পুনঃনির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে ১০ শতাংশ কম ভাড়ায় যাত্রী বহনের আহ্বান জানানো হয়েছে। যাত্রীদের সুবিধার জন্য ডিজিটাল স্ক্রিনে জরুরি হটলাইন নম্বরগুলো প্রদর্শনের পাশাপাশি নারীদের জন্য ব্রেস্টফিডিং কর্নার ও বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ সেবার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
এছাড়া কোরবানির পশু পরিবহন ও দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় নৌযান চলাচলের ক্ষেত্রে আবহাওয়ার সংকেত মেনে চলার বিষয়েও কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রীর মতে, সদরঘাটে কুলিদের উৎপাত বন্ধ করতে এবার ট্রলি সার্ভিস সম্পূর্ণ ফ্রি বা বিনামূল্যে করে দেওয়া হয়েছে, যাতে যাত্রীরা কোনো হয়রানি ছাড়াই ঘাটে যাতায়াত করতে পারেন।
প্রতি বছর ঈদে ঘরমুখো মানুষের যাত্রা নির্বিঘ্ন করতে সরকার নানা পদক্ষেপ নিলেও, তার সফল বাস্তবায়নই মূল চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও লঞ্চে ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন রোধে মাঠপর্যায়ে কঠোর মনিটরিং প্রয়োজন। আইন কেবল খাতায় কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি প্রতিটি ঘাট ও লঞ্চে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবেই নৌপথে ঈদযাত্রা সত্যিই স্বস্তিদায়ক হবে। সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে মালিক, শ্রমিক এবং প্রশাসন—তিন পক্ষেরই দায়িত্বশীল আচরণ ও সহযোগিতা প্রত্যাশিত।