ভারতের মেঘালয় থেকে নেমে আসা তীব্র পাহাড়ি ঢল আর গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণে ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট ও ধোবাউড়া উপজেলার বিস্তীর্ণ জনপদ এখন পানির নিচে। নদীর বাঁধ ভেঙে লোকালয়ে পানি ঢুকে পড়ায় তলিয়ে গেছে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির ফসল পাকা বোরো ধান। মাঠের সোনার ফসল চোখের সামনে তলিয়ে যেতে দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সীমান্তবর্তী এই অঞ্চলের হাজার হাজার কৃষক।
প্রকৃতির রুদ্ররোষে ময়মনসিংহের সীমান্ত জনপদে এখন কেবলই হাহাকার। গত মঙ্গলবার রাত থেকে শুরু হওয়া অঝোর ধারার বৃষ্টি আর উজান থেকে ধেয়ে আসা ঢলে বুধবার রাত পর্যন্ত হালুয়াঘাট উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। এর মধ্যে মাজরাকুড়া, কুমারগাতী, আচকীপাড়া, তেলীখালী, কড়ইতলী ও মহিষলেটিসহ সীমান্তঘেঁষা গ্রামগুলোর অবস্থা সবচেয়ে শোচনীয়। হঠাৎ আসা এই পাহাড়ি ঢল বা আকস্মিক বন্যা (অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি বা উজান থেকে আসা প্রবল পানির প্রবাহ) মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা স্তব্ধ করে দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ভারতের মেঘালয় রাজ্য থেকে নেমে আসা পানির তোড়ে নদ-নদীগুলো ফুঁসে উঠেছে। বুধবার সকালে পানির তীব্র চাপে হালুয়াঘাট উপজেলার ভূবনকুড়া ইউনিয়নের মাজরাকুড়া এলাকায় মেনংছড়া নদীর বাঁধ এবং গাজীরভিটা ইউনিয়নের মধ্য বোয়ালমারা এলাকায় বুড়াঘাট নদীর বাঁধ ভেঙে যায়। বাঁধের ভাঙা অংশ দিয়ে হু হু করে পানি ঢুকে পড়ে লোকালয়ে। বিকেলের দিকে ধোবাউড়া উপজেলার গামারীতলা এলাকায় নেতাই নদীর বেড়িবাঁধও (নদীর তীর রক্ষাকারী মাটির বাঁধ) ভেঙে গিয়ে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত করে। এতে কেবল ফসল নয়, ঘরবাড়ি ও রাস্তাঘাটেরও ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
এবার ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকের মনে আনন্দের যে ঝিলিক ছিল, ঢলের পানিতে তা ম্লান হয়ে গেছে। হালুয়াঘাটের বোয়ালমারা গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলাম আক্ষেপ করে বলেন, "সারা বছর এই এক ফসলের ওপর নির্ভর করে আমাদের সংসার চলে। ধান কাটার ঠিক আগমুহূর্তে এমন সর্বনাশ হবে তা কল্পনাও করতে পারিনি।" ধোবাউড়ার কৃষক আসাদ মিয়ার ভাষ্যমতে, তার তিন কাঠা জমির ধান এখন পানির নিচে। যদি দ্রুত পানি না নামে, তবে সব ধান পচে নষ্ট হয়ে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। কৃষি অফিসের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, কেবল হালুয়াঘাটেই ২২ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে অন্তত ৭০ হেক্টর জমির ধান ইতিমধ্যেই পুরোপুরি তলিয়ে গেছে।
উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সজাগ দৃষ্টি রাখছে। হালুয়াঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফয়সাল আহমেদ জানিয়েছেন, ঢলের পানিতে ফসল ছাড়াও দুটি কাঁচা রাস্তা ভেঙে যোগাযোগ ব্যবস্থায় বিঘ্ন ঘটছে। তবে বৃষ্টি থামলে পানি দ্রুত নেমে যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। ধোবাউড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মোশাররফ হোসেনও কৃষি কর্মকর্তাদের ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে তালিকা তৈরির নির্দেশ দিয়েছেন। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ময়মনসিংহের উপপরিচালক মো. এনামুল হক আশ্বাস দিয়েছেন যে, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা হবে।
প্রকৃতির এই আকস্মিক আঘাত আমাদের কৃষিনির্ভর অর্থনীতির জন্য একটি বড় সতর্কবার্তা। প্রতি বছরই সীমান্ত এলাকায় পাহাড়ি ঢলে কৃষকের স্বপ্নভঙ্গ হয়। এই সমস্যা সমাধানে কেবল ত্রাণের বস্তা নয়, বরং নদীর নাব্য রক্ষা (নদী খনন করে গভীরতা বাড়ানো) এবং দীর্ঘমেয়াদি মজবুত বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি। সীমান্ত নদীগুলোর সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা না হলে কৃষকের ঘাম ও পরিশ্রম বারবার এভাবেই নদীর জলে বিলীন হয়ে যাবে। সরকারের উচিত এই অঞ্চলের কৃষকদের জন্য একটি স্থায়ী ও আধুনিক বন্যা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা।