রাজধানীর উত্তরখানে গ্যাস লাইনের ছিদ্র থেকে ঘরে জমে থাকা গ্যাস বিস্ফোরণে দগ্ধ তিনজনের মধ্যে গৃহকর্তা আলী হোসেন (৫৫) মারা গেছেন। আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাঁর স্ত্রী ও সন্তান বর্তমানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
রোববার সকাল সাড়ে ৬টার দিকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান আলী হোসেন। হাসপাতালের সহকারী অধ্যাপক ডা. শাওন বিন রহমান মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, আলী হোসেনের শরীরের শতভাগ দগ্ধ হয়েছিল। শতভাগ পুড়ে যাওয়ায় তাঁর শ্বাসনালী মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যার ফলে চিকিৎসকদের আপ্রাণ চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।
এর আগে গতকাল শনিবার ভোর ৬টার দিকে উত্তরখানের দুবাদিয়া করাইটেক এলাকার একটি আবাসিক বাসায় এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। উত্তরখান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান জানান, ঘটনার সময় আলী হোসেন ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা ঘুমে ছিলেন। সকালে আলী হোসেনের স্ত্রী হাসনা হেনা (৪৫) রান্নাঘরের চাবি ঘুরিয়ে আগুন জ্বালাতেই পুরো ঘরে মুহূর্তের মধ্যে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে আলী হোসেনের সাথে তাঁর স্ত্রী হাসনা হেনা এবং তাদের ২৮ বছর বয়সী সন্তান আঁখিও মারাত্মকভাবে দগ্ধ হন।
আগুনের তীব্রতায় দগ্ধ তিনজনকে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার করে জাতীয় দগ্ধ ও পুনর্গঠনকারী অস্ত্রোপচার প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, চিকিৎসাধীন হাসনা হেনার শরীরের ৬০ শতাংশ পুড়ে গেছে এবং তাঁর অবস্থাও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। অন্যদিকে, সন্তান আঁখি শরীরের ১৫ শতাংশ দগ্ধ নিয়ে সাধারণ ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। মা ও মেয়ের সুচিকিৎসা নিশ্চিতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করা হচ্ছে বলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হাবিবুর রহমান ঘটনার প্রাথমিক বিবরণ দিয়ে জানান, ওই বাসার তিতাস গ্যাস লাইনের সংযোগস্থলে ছিদ্র ছিল। সারারাত দরজা-জানালা বন্ধ থাকায় সেই ছিদ্র দিয়ে নির্গত গ্যাস ঘরের ভেতর জমা হতে থাকে। সকালে রান্না করতে গিয়ে হাসনা হেনা যখনই আগুন জ্বালান, তখনই জমে থাকা গ্যাসে বিকট শব্দে বিস্ফোরণ ঘটে। আগুনে শুধু মানুষই দগ্ধ হয়নি, ঘরের খাট, আলমারি, লেপ, তোষক, বালিশসহ সমস্ত আসবাবপত্র এবং মূল্যবান গৃহস্থালি সামগ্রী পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
রাজধানী ঢাকা এবং এর আশপাশের এলাকাগুলোতে গ্যাস লাইনের ছিদ্র থেকে সৃষ্ট অগ্নিকাণ্ড ও বিস্ফোরণ এখন নিত্যদিনের ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুরোনো ও জরাজীর্ণ পাইপলাইন, নিম্নমানের সংযোগ সামগ্রী ব্যবহার এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবের কারণেই এই ধরনের দুর্ঘটনা বারবার ঘটছে। বিশেষ করে গ্যাস বিতরণকারী কোম্পানির অবহেলা ও গ্যাস লাইনের যথাযথ তদারকি না থাকায় সাধারণ মানুষের প্রাণহানির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, বদ্ধ ঘরে গ্যাস জমে থাকা অত্যন্ত বিপজ্জনক। রাতের বেলা ঘুমানোর আগে গ্যাসের চাবি ভালোভাবে বন্ধ করা এবং সকালে রান্নাঘরে আগুন জ্বালানোর আগে অন্তত দশ-পনের মিনিট দরজা-জানালা খুলে বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা করা উচিত। কিন্তু অসচেতনতা এবং গ্যাস বিতরণকারী কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে অকালেই ঝরে যাচ্ছে মানুষের প্রাণ।
উত্তরাখনের এই অগ্নিকাণ্ড আবারও আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঘরের ভেতর লুকিয়ে থাকা অদৃশ্য গ্যাস কীভাবে এক মুহূর্তে একটি সাজানো সংসার ধ্বংস করে দিতে পারে। গ্যাস বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর উদাসীনতা এবং জনসচেতনতার অভাবের খেসারত দিতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। প্রতিটি দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠিত হলেও পাইপলাইনের সংস্কার বা তদারকির ক্ষেত্রে বাস্তব কোনো পরিবর্তন চোখে পড়ে না। সরকারের উচিত গ্যাস সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি আবাসিক এলাকার গ্যাস লাইনের নিরাপত্তা পরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা। একটি নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করতে নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় তদারকির বিকল্প নেই।