এক হাতে মেয়েকে বাঁচালেও পদ্মার অতলে হারালেন কলিজার টুকরো ছেলেকে
ঈদ শেষে আনন্দ নিয়ে ঢাকায় ফিরছিলেন শাকিলা। কিন্তু দৌলতদিয়া ঘাটে এক মুহূর্তের প্রলয়ংকরী দুর্ঘটনায় তছনছ হয়ে গেল সব। উত্তাল পদ্মায় বাস ডুবে যাওয়ার পর এক হাতে মেয়েকে জাপটে ধরে সাঁতরে পাড়ে এলেও, অন্য হাতে থাকা প্রিয় ছেলেকে আর ফিরিয়ে আনতে পারেননি এই অভাগী মা।
রাজবাড়ীর দাদশী ইউনিয়নের আগমাড়াই গ্রামের রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ী শরিফুল ইসলামের সাজানো সংসারে নেমে এসেছে শোকের কালো ছায়া। ঈদের ছুটি কাটিয়ে ননদ নিশি আক্তারের সঙ্গে ঢাকা যাওয়ার বায়না ধরেছিলেন শাকিলা বেগম। সঙ্গে ছিল আট বছরের ছেলে সাবিত ও ছোট্ট মেয়ে সাবিহা। নিশির কোলে ছিল তার একমাত্র কন্যা সোহানা। কিন্তু সৌহার্দ্য পরিবহনের সেই বাসটি যখন দৌলতদিয়া পন্টুন (নৌযানের জেটি) থেকে ছিটকে পদ্মায় পড়ে যায়, তখন মুহূর্তেই উৎসবের আমেজ রূপ নেয় আর্তনাদে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও প্রতিবেশি মরিয়ম আক্তারের বর্ণনায় উঠে এসেছে এক রোমহর্ষক লড়াইয়ের গল্প। বাসটি পানিতে তলিয়ে যাওয়ার সময় শাকিলা অসীম সাহসিকতায় এক হাতে মেয়ে সাবিহাকে আঁকড়ে ধরেন। অন্য হাতে সাঁতার কেটে কোনোমতে পন্টুনের কাছে পৌঁছান তিনি। সেখানে অপেক্ষমাণ লোকজনের উদ্দেশ্যে আকুতি জানিয়ে শাকিলা চিৎকার করে বলছিলেন, "ভাই, আমার মেয়েটাকে ধরেন, আমি বাস থেকে ছেলেটাকে নিয়ে আসি।" কিন্তু শাকিলা যখন ছেলেকে উদ্ধারের জন্য আবার পানিতে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছিলেন, তখন উপস্থিত জনতা তাকে আটকে দেয়। তারা বুঝতে পেরেছিলেন, উত্তাল স্রোতে দ্বিতীয়বার ফিরে যাওয়া মানে নিজের মৃত্যু ডেকে আনা। মেয়েসহ শাকিলাকে টেনে উপরে তোলার পরপরই তিনি জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন।
এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় শাকিলের আদরের সন্তান প্রথম শ্রেণির ছাত্র সাবিত (৮) এবং ননদ নিশির একমাত্র মেয়ে সোহানা (১০) না ফেরার দেশে চলে গেছে। ভাগ্যক্রমে বেঁচে ফিরেছে শাকিলার মেয়ে সাবিহা ও ননদ নিশি। বৃহস্পতিবার দুপুরে আগমাড়াই গ্রামে গিয়ে দেখা যায় এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য। দুই শিশুর নিথর দেহ পাশাপাশি রাখা হয়েছে। যে বাড়িতে কয়েকদিন আগেও ঈদের হাসি-তামাশা ছিল, সেখানে এখন কেবলই কান্নার রোল। শরিফুল ইসলাম তার সন্তানের লাশের পাশে পাথর হয়ে বসে আছেন। শাকিলা বেগম কিছুক্ষণ পরপর বিলাপ করে উঠছেন আর জ্ঞান হারাচ্ছেন। একমাত্র সন্তানকে হারানো নিশি আক্তারও নির্বাক হয়ে তাকিয়ে আছেন আকাশের দিকে, যেন চোখের জলও শুকিয়ে গেছে তার।
আত্মীয় সিরাজুল ইসলাম কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "এই দৃশ্য সহ্য করা যায় না। একটা সুখী পরিবার চোখের পলকে এভাবে শেষ হয়ে যাবে, কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।" পুরো গ্রাম এখন স্তব্ধ, শত শত মানুষ ভিড় করেছেন এই শোকাতুর পরিবারটিকে এক নজর সান্ত্বনা দিতে।
দৌলতদিয়া ঘাটের এই দুর্ঘটনা ফের আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিল ফেরি পারাপারের অব্যবস্থাপনা ও নিরাপত্তার অভাবকে। একজন মা তার সন্তানকে বাঁচানোর আপ্রাণ চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছেন, এই দায় কি কেবল ভাগ্যের নাকি আমাদের ব্যবস্থার গাফিলতির? একটি আনন্দঘন ঈদ যাত্রা কেন শেষ হবে কবরের স্তব্ধতায়, সেই প্রশ্ন আজ প্রতিটি বিবেকবান মানুষের কাছে।