তৃণমূল পর্যায়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ জোরদার করার লক্ষ্যে এবার ইউনিয়ন পর্যায়েও সম্প্রসারিত হচ্ছে ‘দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি’ (দুপ্রক)। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে নতুন এই বিশেষ উদ্যোগটি যুক্ত করা হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের একদম প্রান্তিক পর্যায়ে দুর্নীতিবিরোধী সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
বর্তমানে দেশের প্রতিটি মহানগর, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় রয়েছে। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, তৃণমূলের মানুষকে এই প্রক্রিয়ায় আরও গভীরভাবে সম্পৃক্ত করতেই ইউনিয়ন পর্যায়ে এই কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষ সরাসরি দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবেন, যা স্থানীয় পর্যায়ে সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
দুদকের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, নবগঠিত ইউনিয়ন পর্যায়ের এই দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি হবে সাত সদস্যবিশিষ্ট। এই কমিটিতে একজন সভাপতি থাকবেন এবং যোগ্য অন্য সদস্যদের মধ্যে অন্তত এক-তৃতীয়াংশ নারী সদস্য রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সমাজের সৎ, সচেতন ও সামাজিক কাজে স্বেচ্ছাসেবী মনোভাবসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্য থেকেই এই কমিটির সদস্য নির্বাচন করা হবে। তবে কোনো বিদেশি নাগরিক, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি, সরকারের বেতনভুক্ত কর্মচারী, রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী, দেউলিয়া বা কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে অভিযুক্ত ব্যক্তি এই কমিটির সদস্য হতে পারবেন না।
এ বিষয়ে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে এই কমিটি গঠনের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে সরকারের সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি, যেমন—বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা এবং কৃষি উপকরণ বিতরণের ক্ষেত্রে তৃণমূল পর্যায়ে যেসব অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে, তা প্রতিরোধে এই কমিটিগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে নিরপেক্ষ মূল্যায়ন করে নতুন কমিটি গঠন করা প্রয়োজন যাতে কোনো রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত স্বার্থ এখানে প্রাধান্য না পায়।
দুদক সচিব মোহাম্মদ খালেদ রহীম জানিয়েছেন, শুধুমাত্র আইনি বা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে দেশ থেকে দুর্নীতি দূর করা সম্ভব নয়। তৃণমূলের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে একটি সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এতে জনগণের অধিকার সম্পর্কে সচেতনতা বাড়বে এবং স্থানীয় সুশাসন নিশ্চিত হবে।
দুদকের সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বর্তমানে পাঁচ শতাধিক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি সক্রিয় রয়েছে। বিগত বছরগুলোতে এসব কমিটি দেশজুড়ে দেড় সহস্রাধিক আলোচনা সভা, সহস্রাধিক বিতর্ক প্রতিযোগিতা এবং শত শত সচেতনতামূলক শোভাযাত্রার আয়োজন করেছে। এখন ইউনিয়ন পর্যায়েও এই কার্যক্রম বিস্তৃত হলে দেশের দুর্নীতিবিরোধী সামাজিক প্রতিরোধ আরও শক্তিশালী ভিত্তি পাবে।