ওমানের তপ্ত মরুভূমিতে পরিবারের সচ্ছলতার ঘানি টানতে গিয়ে অকালে ঝরে গেল চারটি তাজা প্রাণ। দেশে অপেক্ষমাণ ভাইয়ের বিয়ের কেনাকাটা করতে বেরিয়ে এক মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমিয়েছেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়ার চার সহোদর। মর্মান্তিক এই ঘটনায় মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসী কমিউনিটিসহ পুরো রাঙ্গুনিয়ায় এখন শোকের মাতম চলছে।
নিহত চার ভাই হলেন চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের বান্দারাজার পাড়া এলাকার বাসিন্দা রাসেদুল ইসলাম, শাহেদুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম ও শহিদুল ইসলাম। তারা সবাই জীবিকার তাগিদে দীর্ঘ সময় ধরে ওমানে অবস্থান করছিলেন।
স্থানীয় সূত্র ও প্রবাসীদের মারফত জানা গেছে, নিহতদের পরিবারের মেজ ভাইয়ের বিয়ের কথা চূড়ান্ত হয়েছিল দেশে। সেই উপলক্ষে দুই ভাইয়ের শিগগিরই দেশে ফেরার প্রস্তুতি ছিল। ভাইয়ের বিয়েতে আনন্দ করার জন্য এবং বাড়ির সবার জন্য সওদাপাতি কিনতে মঙ্গলবার (১২ মে) রাতে ওমানের মুলাদ্দা এলাকায় কেনাকাটা করতে বেরিয়েছিলেন চার ভাই। কাজ শেষে ফেরার পথে ক্লান্ত হয়ে তারা গাড়ির ভেতরেই বিশ্রাম নিচ্ছিলেন। প্রাথমিক ধারণা করা হচ্ছে, প্রচণ্ড গরমে গাড়ির শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র বা এসি (বাতাস শীতল রাখার যন্ত্র) চালু রেখে তারা ঘুমিয়ে পড়েছিলেন। সে সময় এসি বিস্ফোরণ অথবা যন্ত্রটি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাস (কার্বন মনোক্সাইড বিষক্রিয়া) গাড়ির ভেতরে ছড়িয়ে পড়ায় দমবন্ধ হয়ে তাদের মৃত্যু হয়।
ঘটনাটি মঙ্গলবার রাতের দিকে ঘটলেও দীর্ঘ সময় গাড়িটি এক জায়গায় স্থির থাকতে দেখে স্থানীয়দের মনে সন্দেহ জাগে। পরদিন বুধবার সকাল ৮টার দিকে স্থানীয় লোকজন বিষয়টি ওমান পুলিশকে জানায়। পুলিশ এসে গাড়ির ভেতর থেকে চার ভাইয়ের নিথর মরদেহ উদ্ধার করে। বর্তমানে মরদেহগুলো ওমানের রুস্তাক জেলা হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে। সেখান থেকে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহগুলো মাস্কাটে পাঠানো হবে বলে জানা গেছে।
লালানগর ইউনিয়নের বাসিন্দারা জানান, চার ভাই একযোগে প্রবাসে থাকায় এলাকায় তাদের পরিবারটি বেশ সচ্ছল ছিল। কিন্তু এক নিমিষেই সাজানো সংসারটি তছনছ হয়ে গেল। নিহতদের স্বজন মো. ইয়াকুব জানান, ওমানে থাকা তাদের এলাকার আরেক প্রবাসী বাবুর মাধ্যমে তারা প্রথম এই খবরটি পান। খবরটি গ্রামে পৌঁছানোর পর থেকেই স্বজনদের বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। পুরো গ্রাম এখন শোকে স্তব্ধ। বাবা-মায়ের চার সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় অবস্থা। তাদের এখন একটাই চাওয়া, প্রিয়জনদের মরদেহ যেন দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হয়।
ওমান পুলিশ এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গাড়ির এসি লিকেজ হয়ে ভেতরে গ্যাস জমে যাওয়াই এই মৃত্যুর প্রধান কারণ হতে পারে। বদ্ধ গাড়িতে দীর্ঘক্ষণ এসি চালু রেখে ঘুমালে কার্বন মনোক্সাইড নামের এক প্রকার বর্ণহীন ও গন্ধহীন গ্যাস তৈরি হয়, যা অত্যন্ত বিষাক্ত। ঘুমের ঘোরে মানুষ বুঝতে পারে না যে তারা ধীরে ধীরে বিষাক্ত বায়ু গ্রহণ করছে, যার ফলে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মৃত্যু ঘটে।
রাঙ্গুনিয়া উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও বিষয়টি তদারকি করা হচ্ছে। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে মরদেহগুলো দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারি সহায়তা দাবি করেছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা। লালানগর ইউনিয়ন পরিষদের পক্ষ থেকে শোকাহত পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
প্রবাসীদের এই অকাল মৃত্যু আমাদের আবারও স্মরণ করিয়ে দেয় যে, কর্মক্ষেত্রে অসচেতনতা এবং ছোটখাটো কারিগরি ত্রুটি কতটা ভয়াবহ হতে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের চরম আবহাওয়ায় প্রবাসীরা অনেক সময় দীর্ঘ ভ্রমণের পর গাড়িতেই বিশ্রাম নেন, কিন্তু এসি চালু রেখে বদ্ধ গাড়িতে ঘুমানোর ঝুঁকি সম্পর্কে অনেকেই অবগত নন। প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য বিদেশের মাটিতে সচেতনতামূলক কর্মশালা এবং নিরাপত্তা নির্দেশনা প্রদান করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে শোকার্ত এই পরিবারের পুনর্বাসনে সরকার এবং প্রবাসী কল্যাণ সংস্থার এগিয়ে আসা উচিত, কারণ এই চার ভাই ছিলেন পরিবারের প্রধান চালিকাশক্তি।