Logo
ট্রেন্ডিং: হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সহস্রাধিক যুবলীগ চেয়ারম্যান পরশ ও স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ আর কখনও কারও কাছে মাথা নত করবে না: সংসদে খলিলুর নেপাল সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা: নিহত ৩৩০, নিখোঁজ সহস্রাধিক

কাপাসিয়ায় সপরিবারে ৫ খুনের বীভৎসতা: পদ্মা নদীতে মিলল ঘাতক ফোরকানের নিথর দেহ

Roksana
29 August 2026, 02:11 AM পড়তে ১ মিনিট
কাপাসিয়ায় সপরিবারে ৫ খুনের বীভৎসতা: পদ্মা নদীতে মিলল ঘাতক ফোরকানের নিথর দেহ

গাজীপুরের কাপাসিয়ায় স্ত্রী, তিন শিশু সন্তান ও শ্যালককে নৃশংসভাবে গলা কেটে হত্যার ঘটনার মূল হোতা ফোরকান মিয়ার জীবনের অবসান হলো এক মর্মান্তিক পরিণতির মধ্য দিয়ে। দেশ কাঁপানো এই হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পলাতক থাকা ফোরকানের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে পদ্মা নদী থেকে, যা এই লোমহর্ষক ঘটনার তদন্তে এক নতুন মোড় নিয়ে এল।

গাজীপুরের কাপাসিয়া উপজেলার সেই অভিশপ্ত রাতের কথা এখনো ভুলতে পারেনি এলাকাবাসী। নিজ হাতে নিজের সাজানো সংসার ধ্বংস করে দিয়ে পালিয়ে যাওয়া ফোরকান মিয়ার করুণ পরিণতি এখন সবার মুখে মুখে। গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) পদ্মা নদী থেকে তার ভাসমান মরদেহ উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এর আগে গত সপ্তাহজুড়ে পুলিশ ও অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) সদস্যরা তার সন্ধানে দেশজুড়ে তল্লাশি চালিয়ে আসছিলেন। ফোরকানের সন্ধানে যখন চারদিকে সাজসাজ রব, ঠিক তখনই পদ্মা সেতুর ওপর থেকে তার ব্যবহৃত ব্যাগ ও পরিধেয় বস্ত্র উদ্ধার করা হয়। অপরাধ তদন্ত বিভাগের ধারণা ছিল, জঘন্য এই অপরাধের গ্লানি সইতে না পেরে কিংবা আইনের হাত থেকে বাঁচতে ফোরকান পদ্মা সেতু থেকে ঝাঁপ দিয়ে আত্মাহুতির পথ বেছে নিয়েছেন। বৃহস্পতিবারের উদ্ধারকৃত মরদেহ সেই ধারণাকেই সত্য বলে প্রমাণ করল।

ভয়াবহ সেই হত্যাকাণ্ডের সূত্রপাত হয়েছিল গত ৮ মে শুক্রবার দিবাগত রাতে। কাপাসিয়া উপজেলার রাউতকোনা গ্রামের প্রবাসী মনির হোসেনের বাড়ির নিচতলায় ভাড়া থাকতেন ফোরকান। সেখানেই ঘটে যায় ইতিহাসের অন্যতম নিকৃষ্টতম হত্যাকাণ্ড। ঘাতকের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে প্রাণ হারান ফোরকানের স্ত্রী শারমিন এবং তাদের তিন অবুঝ কন্যাসন্তান— মীম (১৫), মারিয়া (৮) ও মাত্র দুই বছর বয়সী শিশু ফারিয়া। রেহাই পাননি ফোরকানের শ্যালক রসুল মিয়াও। পেশায় ব্যক্তিগত গাড়িচালক ফোরকান কীভাবে একজন পাষণ্ড খুনিতে রূপান্তরিত হলেন, তা ভেবে আজও শিউরে উঠছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

ঘটনার পরদিন শনিবার সকালে প্রথম প্রকাশ পায় এই বীভৎসতার কথা। ফোরকান নিজেই তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী রাশিদাকে মুঠোফোনে কল করে জানান যে, তিনি পাঁচজনকে হত্যা করে পালিয়ে যাচ্ছেন। খবর পেয়ে প্রতিবেশীরা যখন ওই বাড়িতে প্রবেশ করেন, তখন তারা দেখেন এক হৃদবিদারক দৃশ্য। ঘরের মেঝেতে সারিবদ্ধভাবে পড়ে ছিল তিন নিস্পাপ শিশুর গলাকাটা দেহ। তাদের মা শারমিনের হাত-মুখ বেঁধে জানালার গ্রিলের সাথে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল। আর শ্যালক রসুল মিয়ার নিথর দেহটি পড়ে ছিল বিছানার ওপর। ঘটনাস্থলে তল্লাশি চালিয়ে তদন্তকারীরা দেশীয় মদের খালি বোতল, রান্না করা পায়েশ ও কোমল পানীয়ের বোতল উদ্ধার করেন। ধারণা করা হয়, খুনের আগে কিংবা পরে ঘাতক সেখানে মাদক সেবন করেছিলেন।

হত্যাকাণ্ডের পেছনে থাকা কারণগুলো অনুসন্ধান করতে গিয়ে পুলিশ বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায়। মরদেহের পাশেই পড়ে ছিল কিছু ছাপানো কাগজ, যা ছিল ফোরকানের আগে থেকে করা একটি অভিযোগপত্রের প্রতিলিপি। সেখান থেকে জানা যায়, ফোরকান তার স্ত্রীর বিরুদ্ধে ১০ লাখ টাকা আত্মসাৎ ও পরকীয়ার অভিযোগ তুলে থানায় আবেদন করেছিলেন। নিজের পরিবারের বিরুদ্ধে এমন চরম অভিযোগ তুলে সেই ক্ষোভ থেকেই কি তিনি এই নৃশংস পথ বেছে নিয়েছিলেন? তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক অনুমান ছিল, দীর্ঘদিনের পারিবারিক কলহ এবং স্ত্রীর প্রতি সন্দেহই তাকে এমন উন্মাদনায় ঠেলে দিয়েছে। গোপালগঞ্জ সদরের মেরী গোপীনাথপুর গ্রামের বাসিন্দা ফোরকান প্রায় এক বছর আগে এই এলাকায় ভাড়া থাকতে শুরু করেছিলেন। শান্ত স্বভাবের আড়ালে যে এমন এক হিংস্র মানুষ লুকিয়ে ছিল, তা কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।

ফোরকানকে গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক দল মাঠে নেমেছিল। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্য নিয়ে তার অবস্থান শনাক্ত করার চেষ্টা করা হলেও বারবার তিনি অবস্থান পরিবর্তন করছিলেন। অবশেষে পদ্মা সেতুর ওপর তার কাপড়চোপড় ও ব্যাগ খুঁজে পাওয়ার পর রহস্য ঘনীভূত হয়। তদন্তকারীরা মনে করছেন, আত্মগোপন করার জায়গা না পেয়ে এবং সামাজিক ও আইনি বিচারের ভয়ে তিনি আত্মহননের পথ বেছে নেন। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে এর আগেই দুজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছিল পুলিশ। প্রধান অভিযুক্তের মৃত্যুতে মামলার তদন্ত প্রক্রিয়া এখন ভিন্নখাতে প্রবাহিত হবে বলে মনে করা হচ্ছে।


কাপাসিয়ার এই ঘটনা কেবল একটি হত্যাকাণ্ড নয়, বরং আমাদের ভেঙে পড়া পারিবারিক মূল্যবোধ ও ক্রমবর্ধমান মানসিক অস্থিরতার এক চরম বহিঃপ্রকাশ। সন্দেহের বিষবাষ্প কীভাবে একটি সাজানো বাগানকে মরুভূমি করে দিতে পারে, ফোরকান তার একটি করুণ দৃষ্টান্ত। তবে অপরাধী মারা গেলেও রেখে গেছেন অনেকগুলো অমীমাংসিত প্রশ্ন। আমাদের সমাজে পরকীয়া বা আর্থিক বিরোধের সমাধান কি কেবলই মৃত্যু? নিষ্পাপ শিশুদের রক্তে কেন রঞ্জিত হলো বাবার হাত? এই বীভৎসতা আমাদের শিখিয়ে দেয় যে, পারিবারিক কলহ চরমে পৌঁছানোর আগেই সামাজিক ও আইনি মধ্যস্থতা কতটা জরুরি। এই ট্র্যাজেডি যেন আর কোনো পরিবারকে গ্রাস করতে না পারে, সেজন্য সচেতনতা ও মানসিক সুস্বাস্থ্যের ওপর গুরুত্ব দেওয়া এখন সময়ের দাবি।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
জাতীয়

কাপাসিয়ায় সপরিবারে ৫ খুনের বীভৎসতা: পদ্মা নদীতে মিলল ঘাতক ফোরকানের নিথর দেহ

R
Roksana | 14 May 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার