আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে দেশের সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য টানা সাত দিনের দীর্ঘ ছুটির ঘোষণা দিয়েছে সরকার। ঈদযাত্রা নির্বিঘ্ন করতে এবং সাধারণ মানুষের নাড়ির টানে বাড়ি ফেরার পথ প্রশস্ত করতে সরকারের পক্ষ থেকে এই বিশেষ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদকে সামনে রেখে সরকারি ক্যালেন্ডারে বড় ধরনের পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছিল আগেই। সেই ধারাবাহিকতায় গত বৃহস্পতিবার (১৪ মে) জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে আগামী ২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত টানা সাত দিনের সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের ফলে সরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে উৎসবের আমেজ আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, এর আগে গত ৭ মে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঈদ উপলক্ষে ২৫ মে তারিখটি নির্বাহী আদেশে ছুটি হিসেবে অনুমোদিত হয়। মূলত ঈদের সময় রাজধানী ঢাকা থেকে ঘরমুখো মানুষের ভিড় কমানো এবং সড়ক, রেল ও নৌপথে বাড়তি চাপ সামাল দেওয়ার লক্ষ্যেই এই দীর্ঘ ছুটির পরিকল্পনা করেছে সরকার। তবে এই বাড়তি ছুটির সুবিধা পেতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কিছুটা ত্যাগও স্বীকার করতে হচ্ছে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ২৩ ও ২৪ মে (শনিবার ও রবিবার) সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়া সত্ত্বেও সব অফিস খোলা থাকবে এবং ওই দুই দিন কর্মীদের নিয়মিত অফিস করতে হবে।
চাঁদ দেখা সাপেক্ষে আগামী ২৮ মে দেশে পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণত ঈদের আগের ও পরের কয়েক দিন দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় ব্যাপক চাপ তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে যানজট ও অব্যবস্থাপনার কারণে সাধারণ মানুষের ঈদ আনন্দ ম্লান হয়ে যায়। সরকার আশা করছে, টানা সাত দিনের এই লম্বা ছুটি মানুষকে ধাপে ধাপে বাড়ি ফেরার সুযোগ করে দেবে, যা পরিবহন খাতের ওপর চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এই সাধারণ ছুটির আওতাভুক্ত থাকবে সব ধরনের সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। তবে জনস্বার্থে এবং জরুরি প্রয়োজনে কিছু নির্দিষ্ট খাতকে এই ছুটির আওতামুক্ত রাখা হয়েছে। জরুরি সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো যথারীতি তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে।
ছুটির আওতামুক্ত সেবা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ:
দেশের জননিরাপত্তা এবং জরুরি জীবন রক্ষাকারী ব্যবস্থা সচল রাখতে নির্দিষ্ট কিছু খাতকে ছুটির আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস এবং অন্যান্য জ্বালানি সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা এই সময়ে নিরবচ্ছিন্ন সেবা প্রদানে নিয়োজিত থাকবেন। এছাড়া অগ্নিনির্বাপক বাহিনী (ফায়ার সার্ভিস), দেশের সকল স্থল, নৌ ও সমুদ্রবন্দরের কার্যক্রম, শহর পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম এবং ডাক ও যোগাযোগ সেবার সাথে জড়িত যানবাহন ও কর্মীরা ছুটির দিনগুলোতেও কর্মস্থলে থাকবেন। তথ্যপ্রযুক্তি ও যোগাযোগ সেবা তথা অন্তর্জাল (ইন্টারনেট) ও টেলিফোন সংযোগ সচল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্মীবাহিনী সতর্ক অবস্থানে থাকবে।
বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা খাতকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে হাসপাতাল ও জরুরি চিকিৎসা সেবার সাথে যুক্ত চিকিৎসক, সেবিকা এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের এই ছুটির বাইরে রাখা হয়েছে। একই সাথে ওষুধ ও জরুরি চিকিৎসাসামগ্রী বহনকারী যানবাহন চলাচলের ওপর কোনো বিধিনিষেধ থাকবে না। এছাড়া বিচারিক কার্যক্রমের বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট এবং ব্যাংকিং লেনদেনের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক স্ব-স্ব বিভাগ থেকে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা ও আলাদা নীতিমালা জারি করবে। বেসরকারি শিল্প ও কল-কারখানার ক্ষেত্রে দেশের প্রচলিত শ্রম আইন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় তাদের সিদ্ধান্ত জানাবে।
সরকারের এই সাত দিনের দীর্ঘ ছুটি ঘোষণার সিদ্ধান্তটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ঈদের সময় লাখ লাখ মানুষ শহর ছেড়ে গ্রামে পাড়ি জমান। স্বল্প সময়ের ছুটিতে যখন সবাই একসাথে যাত্রা শুরু করেন, তখন সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি চরমে পৌঁছায়। দীর্ঘ ছুটির কারণে যাত্রীরা তাদের ভ্রমণের পরিকল্পনা কয়েক দিনে ভাগ করে নিতে পারবেন, যা ঈদযাত্রাকে আরও নিরাপদ ও আনন্দদায়ক করবে। তবে একই সাথে মনে রাখা প্রয়োজন, দীর্ঘ ছুটির ফলে প্রশাসনিক কাজে যাতে স্থবিরতা না আসে, সেদিকেও নজর রাখা জরুরি। জরুরি সেবা দানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এই সময় যে বাড়তি চাপ তৈরি হয়, তা সামাল দিতে সংশ্লিষ্ট কর্মীদের অনুপ্রেরণা ও প্রয়োজনীয় সহযোগিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, এই ছুটি যেন কেবল অলস সময় কাটানোর মাধ্যম না হয়ে বরং পরিবারের সাথে পবিত্রতার সাথে ঈদ আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার সুযোগ হয়, সেটাই প্রত্যাশা।