আসন্ন ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহের নতুন মূল্য নির্ধারণ করেছে সরকার। গত বছরের তুলনায় এবার গরুর চামড়ার দাম প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা এবং খাসির চামড়ার দাম ৩ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে, যাতে মৌসুমী ব্যবসায়ী ও কোরবানিদাতারা ন্যায্য মূল্য পান।
পবিত্র ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েক দিন বাকি। বাংলাদেশের চামড়া শিল্পের প্রধান উৎস এই কোরবানির মৌসুমকে ঘিরে ব্যাপক প্রস্তুতি শুরু করেছে সরকার। দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী এই খাতের শৃঙ্খলা বজায় রাখতে এবং মাঠ পর্যায়ে চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় নতুন দাম ঘোষণা করেছে। বুধবার সচিবালয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত কোরবানির পশুর চামড়া সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত এক বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সরকারের নতুন ঘোষণা অনুযায়ী, চলতি বছর রাজধানী ঢাকায় লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে ৬২ থেকে ৬৭ টাকা। গত বছর এই দাম ছিল ৬০ থেকে ৬৫ টাকা। অর্থাৎ, গতবারের চেয়ে এবার প্রতি বর্গফুটে ২ টাকা দাম বাড়ানো হয়েছে। অন্যদিকে, ঢাকার বাইরে লবণযুক্ত প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ধরা হয়েছে ৫৭ থেকে ৬২ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫ থেকে ৬০ টাকা।
ছাগল বা খাসির চামড়ার ক্ষেত্রেও দাম কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। এবার সারাদেশে প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত খাসির চামড়ার দর নির্ধারণ করা হয়েছে ২৫ থেকে ৩০ টাকা। গত বছর যা ছিল ২২ থেকে ২৭ টাকা। এছাড়া বকরির চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয়েছে প্রতি বর্গফুট ২২ থেকে ২৫ টাকা, যা আগের বছর ছিল ২০ থেকে ২২ টাকা। খাসি ও বকরির চামড়ার এই নতুন দর রাজধানী ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে সারাদেশে অভিন্ন থাকবে।
মূল্য নির্ধারণের প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৫ সালেও গরুর চামড়ার দাম ৫ টাকা এবং ছাগলের চামড়ার দাম ২ টাকা বাড়ানো হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় এবারও আন্তর্জাতিক বাজারের চাহিদা ও স্থানীয় শিল্পের সক্ষমতা বিবেচনা করে এই মূল্য সংশোধন করা হয়েছে। চামড়া সংরক্ষণের প্রধান অনুষঙ্গ হলো লবণ। সঠিক সময়ে লবণ না লাগালে চামড়া পচে গুণগত মান নষ্ট হয়ে যায়। তাই এবার সরকার কাঁচা চামড়া সংরক্ষণে গুরুত্বারোপ করে ১৭ কোটি ৬০ লাখ টাকার লবণ বিনামূল্যে বিতরণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, চলতি বছর দেশে প্রায় ১ কোটি পশু কোরবানি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এই বিপুল পরিমাণ চামড়া যেন নষ্ট না হয়, সেজন্য স্থানীয় প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, "আমাদের লক্ষ্য হলো স্থানীয় শিল্প যেন সব চামড়া যথাযথভাবে সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে পারে। যদি দেখা যায় স্থানীয়ভাবে চাহিদা পূরণ হয়ে অতিরিক্ত চামড়া উদ্বৃত্ত থাকছে বা ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত হচ্ছে না, তবেই আমরা কাঁচা চামড়া রপ্তানির অনুমতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করব। তবে এই মুহূর্তে চামড়া রপ্তানির কোনো প্রয়োজন আমরা দেখছি না।"
চামড়া সংরক্ষণের ব্যাপারে জনসচেতনতা বৃদ্ধিতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে মন্ত্রণালয়। চামড়া ছাড়ানোর পরপরই যেন যথাযথ নিয়মে লবণ দিয়ে তা সংরক্ষণ করা হয়, সে বিষয়ে প্রচার চালানো হবে। এ কাজে দেশের ইমাম ও খতিবদের সম্পৃক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে সারাদেশের মসজিদগুলোতে জুমার খুতবায় মুসল্লিদের সচেতন করার অনুরোধ জানানো হয়েছে, যাতে ধর্মীয় অনুভূতি ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি—উভয়ই রক্ষিত হয়।
চামড়া খাতের সিন্ডিকেট (অসাধু ব্যবসায়ী চক্র) রুখতে এবং ট্যানারি (চামড়া প্রক্রিয়াকরণ কারখানা) মালিকরা যেন নির্ধারিত দামেই চামড়া কেনেন, তা তদারকি করতে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বিশেষ টিম সারাদেশে কাজ করবে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে আলাদা পর্যবেক্ষণ দল সার্বক্ষণিক নজরদারি চালাবে।
চামড়া বাংলাদেশের একটি জাতীয় সম্পদ। প্রতি বছর কোরবানির সময় অব্যবস্থাপনা ও লবণের অভাবে বিপুল পরিমাণ চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে, যা জাতীয় অর্থনীতির জন্য বড় ক্ষতি। সরকারের নির্ধারিত এই নতুন মূল্য মাঠ পর্যায়ে কতটুকু বাস্তবায়িত হবে, তা নির্ভর করছে যথাযথ তদারকির ওপর। বিশেষ করে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা যেন আড়তদারদের কাছে জিম্মি না হয়ে পড়েন, সেদিকে লক্ষ্য রাখা জরুরি। কারণ কোরবানির চামড়া থেকে প্রাপ্ত অর্থের বড় একটি অংশ এতিমখানা ও মাদরাসাগুলোতে দান করা হয়। চামড়ার সঠিক দাম নিশ্চিত করা গেলে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের কল্যাণ নিশ্চিত হবে এবং দেশের চামড়া শিল্প আবার তার হারানো গৌরব ফিরে পাবে। যথাযথ সংরক্ষণ ও সঠিক বিপণন ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই খাতের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব।