নারায়ণগঞ্জের খামার থেকে বিক্রি হওয়া আলোচিত বিরল অ্যালবিনো জাতের মহিষ ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’ শেষ পর্যন্ত কোরবানির বদলে মিরপুর জাতীয় চিড়িয়াখানায় স্থান পেয়েছে। জিনগত কারণে গোলাপি বর্ণের এই অমূল্য প্রাণীকে বাঁচাতে মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপে ক্রেতাকে ন্যায্যমূল্য বুঝিয়ে দিয়ে মহিষটিকে রাষ্ট্রীয় হেফাজতে নেওয়া হয়েছে।
বুধবার গভীর রাতে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে আলোচিত এই মহিষটিকে ঢাকার মিরপুরে অবস্থিত জাতীয় চিড়িয়াখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাকে নিরাপদ পরিবেশে রাখা এবং সঠিক পরিচর্যার জন্য এরই মধ্যে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে কর্তৃপক্ষ। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক বার্তার মাধ্যমে দেশবাসীকে এই খবর নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, মহিষটির জন্য চিড়িয়াখানায় একটি বড় শেড (আবাসিক ঘর) প্রস্তুত করা হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক চিকিৎসার জন্য প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরকে কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মহিষটি দেখতে আর দশটা সাধারণ মহিষের মতো নয়। এটি মূলত একটি ‘অ্যালবিনো’ (জিনগত ত্রুটির কারণে রঞ্জক পদার্থহীন) প্রজাতির প্রাণী। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রাণীর শরীরে ‘মেলানিন’ নামক রঞ্জক পদার্থের অভাব থাকলে চামড়া ও পশমের রং এমন গোলাপি বা সাদাটে হয়ে যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, প্রতি দশ হাজার মহিষের মধ্যে মাত্র একটির এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। ফলে প্রাণীটি কেবল বিরলই নয়, এটি ভবিষ্যৎ গবেষণা ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক অমূল্য বৈজ্ঞানিক সম্পদ।
নারায়ণগঞ্জ শহরের পাইকপাড়া এলাকার রাবেয়া অ্যাগ্রো ফার্মে (কৃষি খামার) জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই মহিষটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’। খামারের মালিক জিয়াউদ্দিন মৃধার ছোট ভাই মূলত মহিষটির সোনালি চুল ও চোখের গঠনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক রাষ্ট্রপতির অদ্ভুত মিল পেয়ে আদর করে এই নাম রাখেন। দেশীয় গণমাধ্যমের গণ্ডি পেরিয়ে ফরাসি বার্তা সংস্থা এএফপি এবং ব্রিটিশ বার্তা সংস্থা রয়টার্সের মতো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও প্রাণীটিকে নিয়ে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা একে রাতারাতি বিশ্বজুড়ে পরিচিতি এনে দেয়।
সাতশত কেজি ওজনের এই বিশাল মহিষটিকে কোরবানির উদ্দেশ্যে প্রতি কেজি ৫৫০ টাকা দরে মোট তিন লাখ পঁচাশি হাজার টাকায় কিনেছিলেন ঢাকার কেরানীগঞ্জের জিনজিরার বাসিন্দা মনিরুজ্জামান সামির। গত সোমবার সন্ধ্যায় ক্রেতা যখন মহিষটিকে নিতে খামারে যান, তখন এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। দীর্ঘদিনের লালন-পালনের মায়ায় খামারিরা প্রাণীটিকে গোসল করিয়ে রাজকীয় পোশাক পরান। এরপর রঙিন ধোঁয়া উড়িয়ে এবং লাল গালিচায় হাঁটিয়ে প্রাণীটিকে বিদায় জানানো হয়। এসময় খামারের লোকজনের চোখে পানি চলে আসে।
তবে কেরানীগঞ্জের বাসায় নেওয়ার পর থেকেই বাধে বিপত্তি। আলোচিত এই মহিষটিকে একনজর দেখতে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত উৎসুক জনতার ঢল নামে ক্রেতার বাড়িতে। মানুষের উপচে পড়া ভিড় সামলাতে না পেরে ক্রেতা বাধ্য হয়ে মহিষটিকে ঘরের ভেতর আটকে রাখেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিশেষ হস্তক্ষেপে বুধবার বিকেলে পুলিশ প্রাণীটিকে উদ্ধার করে কেরানীগঞ্জ থানায় নিয়ে যায়। থানায় নেওয়ার পরও সেখানে হাজারো মানুষ জড়ো হয়। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাতেই সেটিকে চিড়িয়াখানায় হস্তান্তর করা হয়।
প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি তিনি প্রধানমন্ত্রীকে অবগত করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রীও এই বিরল প্রাণী সংরক্ষণের উদ্যোগকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তবে মহিষটির ক্রেতা মনিরুজ্জামান যেন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হন বা তার কোরবানি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সেজন্য তাকে পশুর ন্যায্যমূল্য বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং কোরবানির জন্য একটি বিকল্প গরুরও ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়েছে। প্রতিমন্ত্রী তার বার্তায় আরও উল্লেখ করেন, মানুষ, প্রকৃতি ও প্রাণিসম্পদের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে একটি সমৃদ্ধ ও মানবিক বাংলাদেশ গড়াই বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
কোরবানির হাটে বিক্রি হওয়া একটি বিরল প্রাণীকে বাঁচিয়ে সরকারি উদ্যোগে চিড়িয়াখানায় সংরক্ষণের এই ঘটনা দেশের প্রাণিসম্পদ রক্ষার ইতিহাসে নিঃসন্দেহে একটি মাইলফলক। এটি প্রমাণ করে যে, প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের প্রতি আমাদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সচেতনতা বাড়ছে। তবে শুধু আলোচিত হওয়ার পরই নয়, দেশের আনাচে-কানাচে থাকা এমন সব বিরল বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীর তথ্য আগে থেকেই সংগ্রহ করা প্রয়োজন। প্রান্তিক খামারিদের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিরল প্রাণী সুরক্ষায় দীর্ঘমেয়াদি ও সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা এখন সময়ের দাবি, যাতে ভবিষ্যতের যেকোনো অমূল্য প্রাণী হারিয়ে যাওয়ার হাত থেকে রক্ষা পায়।