পবিত্র ঈদুল আজহার টানা ছুটির প্রভাবে অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে রাজধানীর কাঁচাবাজারগুলো। কোরবানির মাংসের ভিড়ে বাজারে সবজির ক্রেতা কম থাকলেও, সরবরাহ সংকটের অজুহাতে প্রায় প্রতিটি সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গেছে। হঠাৎ এই বাড়তি দামে বাজার করতে এসে চরম অস্বস্তিতে পড়েছেন সাধারণ ক্রেতারা।
পবিত্র ঈদুল আজহার আমেজ এখনও পুরোপুরি কাটেনি। ঘরে ঘরে চলছে কোরবানির মাংসের নানা পদের আয়োজন। কিন্তু প্রতিদিন কি আর কেবল মাংস দিয়ে পাত ভরে? একটু শাকসবজি বা তরকারির প্রয়োজন তো পড়েই। আর এই তাগিদ থেকেই শুক্রবার (২৯ মে) সকালে রাজধানীর বিভিন্ন বাজারগুলোতে ছুটেছেন অনেক ক্রেতা। কিন্তু সেখানে গিয়ে তাদের চোখ রীতিমতো চড়কগাছ। ঈদের ছুটির প্রভাবে বাজারে বেশিরভাগ দোকানপাট বন্ধ, কাঁচামালের সরবরাহও তলানিতে। আর এই সুযোগে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্রেতারা।
রাজধানীর রামপুরা, মালিবাগ, খিলগাঁও এবং বনশ্রী এলাকার বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এমন হতাশাজনক চিত্রই চোখে পড়ে। মালিবাগ হাজীপাড়া বউবাজার এবং খিলগাঁও তালতলা বাজারে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ সবজি বিক্রেতাই তাদের দোকান খোলেননি। হাতেগোনা যে কয়েকজন পসরা সাজিয়ে বসেছেন, তাদের কাছেও সবজির পরিমাণ বেশ কম। মহল্লার খুচরা বিক্রেতারা বলছেন, বড় আড়তগুলোতে (যেখানে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি পণ্য এনে পাইকারি দরে বিক্রি করা হয়) সবজির সরবরাহ একদমই নেই। যারাও বা একটু মাল এনেছেন, তারা দাম হাঁকছেন আকাশছোঁয়া।
বাজারের দাম পর্যালোচনা করে দেখা যায়, ক্রেতাদের পকেটে রীতিমতো টান পড়ছে। ঈদের মাত্র দুদিন আগেও যে পাকা টমেটো ৮০ থেকে ৯০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, তা এখন এক লাফে ১০০ থেকে ১৩০ টাকায় ঠেকেছে। বেগুন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়, যা আগে ছিল মাত্র ৬০ থেকে ৭০ টাকা। তিতকুটে করলার দামও যেন ক্রেতাদের জন্য আরও তেতো হয়েছে। ৫০ থেকে ৬০ টাকার করলা এখন বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। একইভাবে, ৬০ টাকার কাঁকরোল কিনতে ক্রেতাদের গুনতে হচ্ছে ৭০ থেকে ৯০ টাকা। আর ৫০ থেকে ৬০ টাকার ঢ্যাঁড়স বিক্রি হচ্ছে ৭০ থেকে ৮০ টাকায়।
সবজির পাশাপাশি রান্নার অন্যতম অনুষঙ্গ কাঁচা মরিচ এবং সালাদের শসার দামেও লেগেছে উত্তাপ। ঈদের আগে যে কাঁচা মরিচ ২০ টাকা পোয়া (২৫০ গ্রাম) বিক্রি হয়েছে, তা এখন লাফিয়ে ৩০ থেকে ৪০ টাকায় গিয়ে পৌঁছেছে। সালাদের জন্য অপরিহার্য শসা ৩০ থেকে ৪০ টাকা থেকে বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ৭০ টাকায়। এমনকি সুযোগ বুঝে কিছু কিছু জায়গায় তা ১০০ টাকা কেজিতেও বিক্রি হতে দেখা গেছে।
হঠাৎ এই দাম বাড়ার কারণ কী? এমন প্রশ্নের জবাবে রামপুরা বাজারের সবজি বিক্রেতা কায়সার জানান, ঈদের ছুটির কারণে রাজধানী সংলগ্ন ও দূরের অধিকাংশ আড়ত বন্ধ রয়েছে। গ্রাম থেকে সবজিবাহী
ট্রাকগুলোও ঢাকায় আসছে না বললেই চলে। এ কারণে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ একেবারেই কমে গেছে। তিনি বলেন, "বৃহস্পতিবার ঈদ গেছে, আজ শুক্রবার না হলে আমিও দোকান খুলতাম না। ঢাকার মানুষ সাধারণত শুক্রবারের ছুটির দিনেই বেশি বাজার করেন। তাই কিছু বিক্রি হবে এই আশায় অল্প কিছু সবজি নিয়ে বসেছি। দু-একদিনের মধ্যে ট্রাক আসা শুরু হলে দাম আবার স্বাভাবিক হয়ে আসবে।"
ভ্যানে করে পাড়ায় পাড়ায় সবজি বিক্রি করেন টিটু মিয়া। গত সাত বছর ধরে ঢাকায় এই ব্যবসা করছেন তিনি। অভিজ্ঞতার আলোকে টিটু মিয়া বলেন, "কোরবানির ঈদের পর এমনিতেই কয়েকদিন সবজি বিক্রি খুব কম হয়। কিন্তু এবার আড়তেই সবকিছুর দাম বাড়তি। তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরও কেজিতে ২০ টাকার মতো বেশি দামে খুচরা বিক্রি করতে হচ্ছে।"
এদিকে, চড়া দামে সবজি কিনতে এসে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ ক্রেতাদের। রামপুরা বাজারে বাজার করতে আসা বেসরকারি চাকরিজীবী নাজমুল হোসেন কিছুটা আক্ষেপের সুরেই বললেন, "কোরবানির পর তো আর সংসার থেমে থাকে না। কেবল মাংস দিয়ে তো আর প্রতিদিন ভাত খাওয়া যায় না। তাই একটু ভিন্ন স্বাদের আশায় সবজি কিনতে এসেছিলাম, কিন্তু এসে দেখি সবকিছুর দাম আগুন।"
একই ধরনের হতাশা প্রকাশ করেন খিলগাঁও তালতলা বাজারের ক্রেতা কামাল মোশাররফ। তিনি বলেন, "ঈদের আগে যে টমেটো ৮০ টাকায় কিনেছি, আজ তা ১২০ টাকা দিয়ে নিতে হলো। বাসায় মাংসের অনেক পদ রান্না হলেও, শরীরের সুস্থতার জন্য সবজি তো খেতে হবে। না হলে তো অসুস্থ হয়ে পড়ব। কিন্তু বাজারে এসে এই দাম দেখলে সুস্থ মানুষেরও তো অসুস্থ হয়ে যাওয়ার জোগাড়!"
সবজি বিক্রেতা মো. বকুলের কণ্ঠে অবশ্য ভবিষ্যতের বাজার নিয়ে আরও দুঃসংবাদ শোনা গেল। তিনি জানান, কয়েকদিন টানা বৃষ্টির কারণে দেশের বিভিন্ন স্থানে সবজি খেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখন ঢাকায় মানুষ কম থাকায় এবং ঘরে ঘরে মাংস থাকায় সবজির চাহিদা তুলনামূলক কম, তাই দাম কিছুটা কম বেড়েছে। কিন্তু ঈদের ছুটি শেষে যখন ঢাকায় মানুষ ফিরবে এবং সবজির স্বাভাবিক চাহিদা তৈরি হবে, তখন সরবরাহ না বাড়লে দাম আরও ভয়াবহভাবে বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঈদের পর বাজারে সবজির এই আকস্মিক মূল্যবৃদ্ধি আমাদের বাজার ব্যবস্থাপনা ও তদারকি ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়। উৎসবের সময় পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় সাময়িক ঘাটতি থাকবে, এটি একটি স্বাভাবিক বিষয় হলেও, এর সুযোগ নিয়ে পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ে যেভাবে অতিরিক্ত মুনাফা লুটে নেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়, তা সাধারণ মানুষের জন্য চরম ভোগান্তির কারণ। সংকটকালে পণ্যের দাম স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও আগে থেকে কার্যকর, কঠোর ও দূরদর্শী বাজার পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন, যাতে উৎসবের আনন্দ কোনোভাবেই নিত্যপণ্যের দামের কাছে ম্লান হয়ে না যায়।