ঈদের ছুটির আমেজে চিরচেনা ব্যস্ত রাজধানী ঢাকা এখন অনেকটাই শান্ত ও ফাঁকা। যানজট আর কোলাহলমুক্ত এই সময়ে প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এখনও নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছেন অসংখ্য মানুষ। চিরচেনা ভিড়, ভোগান্তি বা অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ না থাকায় দেরিতে ফেরা এই যাত্রীদের চোখেমুখে দেখা যাচ্ছে পরম স্বস্তি ও আনন্দ।
ঈদের ছুটির স্নিগ্ধতা এখন পুরো রাজধানীজুড়ে বিরাজ করছে। যে ঢাকা শহর সারা বছর তীব্র যানজট, গাড়ির তীক্ষ্ণ শব্দ আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলায় মুখর থাকে, সেই শহর এখন একেবারেই কোলাহলমুক্ত। রাস্তাঘাটে যানবাহনের চাপ নেই বললেই চলে। এই ফাঁকা শহরের সুযোগ নিয়েই শুক্রবার (২৯ মে) সকাল থেকে রাজধানীর বিভিন্ন যাত্রীবাহী গাড়ির আস্থান (যেখান থেকে দূরপাল্লার গাড়ি ছেড়ে যায়) এবং গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মোড়গুলোতে ঘরমুখো মানুষের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি চোখে পড়ে। তবে অন্যান্য বছর ঈদের আগের দিনগুলোতে যেমন উপচে পড়া ভিড়, ঠেলাঠেলি বা গাড়ির ছাদে ওঠার মতো ভয়ংকর বিশৃঙ্খলা দেখা যায়, এবারের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। একেবারেই শান্ত, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে মানুষ নিজ নিজ গন্তব্যের গাড়িতে উঠছেন।
অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, ঈদের দিন পেরিয়ে যাওয়ার পরও কেন মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন? এর পেছনে রয়েছে নানা বাস্তব কারণ। অনেকেই চিকিৎসা, আইনশৃঙ্খলা বা জরুরি সেবামূলক কাজে যুক্ত থাকার কারণে ঈদের আগে ছুটি পাননি। আবার এমন অনেকেই আছেন, যাদের ব্যক্তিগত ব্যবসা বা পেশাগত নানা দায়বদ্ধতার কারণে ঈদের আগের দিন পর্যন্ত কাজ করতে হয়েছে। মূলত এই খেটে খাওয়া ও দায়িত্বশীল মানুষগুলোই এখন তাদের প্রিয়জনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে গ্রামের বাড়ির দিকে ছুটে চলেছেন। তাদের কাছে দেরি করে বাড়ি ফেরাটা কোনো আক্ষেপের বিষয় নয়, বরং স্বস্তির।
রাজধানীর বিভিন্ন টিকিট বিক্রয়কেন্দ্র (যেখানে ভ্রমণের আগাম বা তাৎক্ষণিক টিকিট বিক্রি হয়) ঘুরে দেখা যায়, যাত্রীরা বেশ ফুরফুরে মেজাজে অপেক্ষা করছেন। একাধিক যাত্রীর সঙ্গে কথা বলে তাদের এই তৃপ্তির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তারা জানান, ঈদের আগে রাস্তায় যে ভয়াবহ যানজট থাকে, তা এড়িয়ে একটি আরামদায়ক ও নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতেই তারা সচেতনভাবে ঈদের দ্বিতীয় দিনকে বেছে নিয়েছেন। পরিবারের সঙ্গে ঢাকায় ঈদের প্রথম দিনটি উদযাপন করে অনেকেই এখন ছুটছেন গ্রামের বাড়িতে থাকা মা-বাবা বা অন্যান্য আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে দেখা করতে।
ফাঁকা রাস্তায় গাড়ি চলার আনন্দই যে আলাদা—এমন মন্তব্য করে এক যাত্রী জানান, সাধারণত ঢাকা থেকে বের হতেই কয়েক ঘণ্টা সময় নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু এখন রাস্তাঘাট একেবারেই ফাঁকা থাকায় খুব অল্প সময়েই নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব হচ্ছে। যানজটের কোনো শারীরিক বা মানসিক ক্লান্তি না থাকায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের জন্যও এবারের এই ঈদযাত্রা অনেক বেশি আরামদায়ক হয়ে উঠেছে।
সরেজমিনে আরও দেখা যায়, কেবল নির্ধারিত স্থানগুলো থেকেই নয়, রাজধানীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মোড় থেকেও যাত্রীরা সরাসরি গাড়িতে উঠছেন। পরিবহন শ্রমিকরাও বেশ হাসিমুখে যাত্রীদের তুলে নিচ্ছেন। ভাড়ার ক্ষেত্রেও কোনো ধরনের অতিরিক্ত চাপ বা জবরদস্তির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ঢাকার বড় বড় যাত্রীছাউনিগুলোতে ঘুরে দেখা গেছে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। যাত্রীরা গল্পগুজব করতে করতে নিজেদের গাড়ির জন্য অপেক্ষা করছেন, যা সাধারণ সময়ে কল্পনাও করা যায় না। সব মিলিয়ে ঈদের পরের এই যাত্রায় নেই কোনো হুড়োহুড়ি, আছে কেবল নিশ্চিন্তে বাড়ি ফেরার অনাবিল আনন্দ।
দেরিতে হলেও মানুষের এই নির্বিঘ্ন বাড়ি ফেরা আমাদের সামগ্রিক পরিবহন ব্যবস্থার একটি ইতিবাচক দিক তুলে ধরে। সবাই যদি একই সময়ে ঢাকা ছাড়ার প্রতিযোগিতায় না নেমে, নিজেদের সুবিধা ও সুযোগ অনুযায়ী ভ্রমণের সময় ভাগ করে নেন, তবে প্রতিটি ঈদ যাত্রাই হতে পারে এমন চিরকালীন স্বস্তির। যানজটমুক্ত, নিরাপদ ও ভোগান্তিহীন এমন যাত্রাই তো দেশের প্রতিটি নাগরিকের প্রাপ্য। সুষ্ঠু পরিকল্পনার মাধ্যমে আগামী দিনের পরিবহন ব্যবস্থাকে আমরা এমনই সুশৃঙ্খল রূপে দেখতে চাই।