রাজধানী ঢাকার সুপ্রিম কোর্ট (সর্বোচ্চ আদালত) সংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসবমুখর পরিবেশে পবিত্র ঈদুল আজহার দেশের প্রধান জামাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালে এই সুবিশাল জামাতে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত এই জামাতে ফুটে ওঠে সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের এক অনন্য চিত্র।
পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ মুসলিম সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় উৎসব। ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির মহিমায় ভাস্বর এই দিনটিতে মহান আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় পশু কোরবানি করে থাকেন ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা। এই উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ হলো ঈদের জামাত বা সম্মিলিত নামাজ। প্রতি বছরের মতো এবারও বৃহস্পতিবার (২৮ মে) সকাল সাড়ে সাতটায় রাজধানীর জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে
অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশের প্রধান ঈদ জামাত।
ভোরের আলো ফোটার পর থেকেই রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলে দলে সাধারণ মুসল্লিরা (যাঁরা নামাজ আদায় করেন) ছুটতে থাকেন জাতীয় ঈদগাহের দিকে। সবার মুখে মুখে ছিল তাকবিরের ধ্বনি, যা পুরো ময়দান ও আশপাশের এলাকায় এক স্বর্গীয় আবেশ তৈরি করে। উৎসবের আমেজ আর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধন তৈরি হয় সেখানে। নতুন পোশাক গায়ে জড়িয়ে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
রাষ্ট্রের শীর্ষ ব্যক্তিদের অংশগ্রহণ এই জামাতের গুরুত্ব আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়। নির্ধারিত সময়ের আগেই ঈদগাহে উপস্থিত হতে শুরু করেন রাষ্ট্রের অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরা। ঘড়ির কাঁটায় তখন সকাল ৭টা ১৯ মিনিট, এমন সময় জাতীয় ঈদগাহ ময়দানে এসে পৌঁছান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। এর ঠিক আট মিনিট পর, অর্থাৎ সকাল ৭টা ২৭ মিনিটের দিকে রাষ্ট্রীয় শিষ্টাচার মেনে ময়দানে এসে পৌঁছান রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। সাধারণ মুসল্লিদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নিতে তাঁরা সামনের সারিতে জায়গা করে নেন।
রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও এই বিশাল জামাতে অংশ নেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্তরের ব্যক্তিবর্গ। তাঁদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের সভাপতি, প্রধান বিচারপতি, মন্ত্রিপরিষদের বিভিন্ন সদস্য এবং ঢাকায় নিযুক্ত বিভিন্ন মুসলিম দেশের কূটনীতিকরা (অন্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্বকারী কর্মকর্তা)। এছাড়া ঊর্ধ্বতন সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা, দেশের বিশিষ্ট নাগরিকসহ সর্বস্তরের লাখো মুসল্লি এক কাতারে দাঁড়িয়ে মহান আল্লাহর দরবারে মাথা নত করেন।
দেশের প্রধান এই ঈদ জামাতকে কেন্দ্র করে জাতীয় মসজিদ ও এর আশপাশের বিশাল এলাকায় ব্যাপক ও নিশ্ছিদ্র (যেখানে কোনো ফাঁকফোকর নেই) নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সমন্বয়ে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা হয় পুরো ঈদগাহ ময়দান ঘিরে। যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে প্রবেশের প্রতিটি পথে বসানো হয় তল্লাশিচৌকি। নিরাপত্তা তোরণ পেরিয়ে এবং কঠোর তল্লাশির মধ্য দিয়েই সবাইকে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে।
নিরাপত্তার স্বার্থে ওই এলাকার যান চলাচলেও আনা হয়েছিল বিশেষ পরিবর্তন। জাতীয় ঈদগাহ ও সংলগ্ন সড়কগুলোতে সাধারণ যানবাহন চলাচলে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। পাশাপাশি যত্রতত্র গাড়ি রাখার ক্ষেত্রেও ছিল কড়া নিষেধাজ্ঞা। কেবল অনুমোদিত স্থানেই গাড়ি রাখার অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, যাতে মুসল্লিরা নির্বিঘ্নে ও শান্তিতে হেঁটে ঈদগাহে প্রবেশ করতে পারেন। নামাজ শেষে দেশ ও জাতির কল্যাণ কামনায় বিশেষ মোনাজাত করা হয় এবং এরপর পরস্পরের সঙ্গে কোলাকুলি ও কুশল বিনিময়ের মাধ্যমে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন উপস্থিত সবাই।
জাতীয় ঈদগাহে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের এক কাতারে দাঁড়িয়ে নামাজ আদায়ের দৃশ্য আমাদের একটি গভীর বার্তা দেয়। ইসলামের দৃষ্টিতে সকল মানুষ যে সমান, ধনী-দরিদ্রের যে কোনো ভেদাভেদ নেই—এই দৃশ্য তারই বাস্তব প্রমাণ। তবে কেবল ঈদের দিনেই নয়, এই সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও ত্যাগের শিক্ষা যদি আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় ধারণ করতে পারি, তবে সমাজ থেকে সব বৈষম্য দূর করা সম্ভব। ঈদের এই ঐক্যবদ্ধ চিত্র আমাদের জাতীয় জীবনেও প্রতিফলিত হোক এবং সহনশীল সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখুক, এটাই হতে পারে আজকের দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা।