সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে গণপরিবহন চালকদের কর্মঘণ্টা নিয়ে কড়া নির্দেশনা ও সতর্কবার্তা জারি করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)। কোনো চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি গাড়ি চালাতে পারবেন না এবং দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টার বেশি দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না বলে সাফ জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
ঢাকা: দেশের সড়কগুলোতে ক্রমবর্ধমান দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি নিয়ন্ত্রণে এবার কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকারি সড়ক পরিবহন নিয়ন্ত্রক সংস্থা বিআরটিএ। গণপরিবহন চালকদের অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা ডিউটি করার কারণে সৃষ্ট ক্লান্তি ও অসতর্কতা দূর করতে সংস্থাটি এক বিশেষ নির্দেশনা জারি করেছে। শনিবার (২৩ মে) বিআরটিএর সদর কার্যালয় থেকে প্রকাশিত এক সতর্কীকরণ বিজ্ঞপ্তিতে এই নির্দেশনা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়।
বিআরটিএর বিজ্ঞপ্তিতে বিদ্যমান মোটরযান আইন ও বিধিমালার বরাত দিয়ে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, কোনো গণপরিবহন চালক একটানা পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় কোনো যানবাহন চালাতে পারবেন না। একটানা পাঁচ ঘণ্টা গাড়ি চালানোর পর চালককে অবশ্যই অন্তত আধা ঘণ্টা (৩০ মিনিট) বিশ্রাম দিতে হবে। এই বিশ্রামের পর তিনি সর্বোচ্চ আরও তিন ঘণ্টা গাড়ি চালাতে পারবেন। সেই হিসাব অনুযায়ী, একজন পেশাদার চালক দিনে সর্বোচ্চ আট ঘণ্টা এবং সপ্তাহে সব মিলিয়ে ৪৮ ঘণ্টার বেশি কোনোভাবেই গাড়ি চালাতে পারবেন না।
বিআরটিএ জানায়, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা ও বিশ্রামের সময়সীমা অমান্য করে অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালালে চালকের শারীরিক ও মানসিক অবসাদ দেখা দেয়। দীর্ঘ সময় একটানা স্টিয়ারিং ধরে রাখার ফলে মনোযোগ বিঘ্নিত হয়, যা মহাসড়ক ও সাধারণ সড়কে বড় ধরনের দুর্ঘটনার অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে চালক এবং মোটরযান মালিক উভয় পক্ষকেই এই নির্ধারিত সময়সীমা কঠোরভাবে মেনে চলার জন্য অনুরোধ করা হয়েছে।
সংস্থাটি হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছে, যদি কোনো চালক বা মালিক এই নির্দেশনা অমান্য করেন এবং অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালান, তবে সংশ্লিষ্ট চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স (যানবাহন চালনার অনুমতিপত্র) এবং ওই যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন (সরকারি নিবন্ধন) সরাসরি বাতিল করা হবে। সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে কোনো প্রকার শিথিলতা দেখানো হবে না বলেও বিজ্ঞপ্তিতে সতর্ক করা হয়েছে।
পরিবহন বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশের দূরপাল্লার সড়কগুলোতে রাতের বেলায় বা উৎসবের মৌসুমে চালকেরা পর্যাপ্ত বিশ্রাম ছাড়াই অনবরত গাড়ি চালান। অনেক সময় মালিকদের চাপের মুখে বা অতিরিক্ত আয়ের আশায় চালকেরা দিনে ১৪ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত গাড়ি চালিয়ে থাকেন। এর ফলে চোখের পলকে ঘটে যায় মারাত্মক দুর্ঘটনা। বিআরটিএর এই নতুন নির্দেশনা এই বিপজ্জনক প্রবণতা রোধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে, যদি তা মাঠপর্যায়ে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়।
এ ছাড়া, সড়কে যেকোনো ধরনের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি হলে বা নিরবচ্ছিন্ন যানবাহন চলাচল সচল রাখার প্রয়োজনে চালক ও মালিকদের সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষের (কন্ট্রোল রুম) নির্ধারিত নম্বরগুলোতে তাৎক্ষণিকভাবে যোগাযোগ করার জন্য পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সড়ক দুর্ঘটনা রোধে বিআরটিএর এই কর্মঘণ্টা নির্ধারণের সিদ্ধান্তটি অত্যন্ত সময়োপযোগী এবং প্রশংসনীয়। তবে আমাদের দেশের পরিবহন খাতের বাস্তবতায় এটি বাস্তবায়ন করা বড় একটি চ্যালেঞ্জ। মহাসড়কগুলোতে চালকদের এই কর্মঘণ্টা বা বিশ্রামের বিষয়টি তদারকি করার জন্য সুনির্দিষ্ট কোনো ট্র্যাকিং ব্যবস্থা বা ডিজিটাল লগবুক (ভ্রমণ বিবরণী খাতা) নেই। আইন প্রণয়নের পাশাপাশি যদি হাইওয়ে (মহাসড়ক) পুলিশ ও বিআরটিএর ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে নিয়মিত তল্লাশি ও কঠোর তদারকি নিশ্চিত করা না যায়, তবে এই নির্দেশনার সুফল সাধারণ মানুষ কতটা পাবে, তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়। মানুষের জীবনের সুরক্ষায় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক সংগঠনগুলোরও এ বিষয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেওয়া জরুরি।