জাতীয় স্বার্থ এবং দেশের সামগ্রিক পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনায় বহুল আলোচিত পদ্মা ব্যারেজ (নদী বাঁধ) প্রকল্পটির বাস্তবায়নযোগ্যতা নিশ্চিত হয়েছে এবং এর চূড়ান্ত নকশাও প্রস্তুত করা হয়েছে। পানিসম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জাতীয় সংসদে এই তথ্য জানিয়েছেন। রোববার (২১ জুন) জাতীয় সংসদে এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী এ কথা উল্লেখ করেন।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সংসদ সদস্য মো. নূরুল ইসলামের টেবিলে উপস্থাপিত এক প্রশ্নের জবাবে পানিসম্পদ মন্ত্রী জানান, প্রকল্পটি শুধু কৃষি বা মৎস্য খাতের জন্যই নয়, বরং দেশের পরিবেশ রক্ষা এবং আঞ্চলিক অর্থনৈতিক উন্নয়নে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানি সংকট দূরীকরণে এটি দীর্ঘমেয়াদি অবদান রাখবে।
মন্ত্রী তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন যে, পদ্মা ব্যারেজ প্রকল্প কোনো নতুন বিষয় নয়। ১৯৬০ থেকে ২০০০ সালের মধ্যে ব্যারেজ নির্মাণের উপযুক্ত স্থান খুঁজে বের করতে চারটি আন্তর্জাতিক সমীক্ষা পরিচালিত হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০০২ সালে ওয়াটার রিসোর্সেস প্ল্যানিং অর্গানাইজেশন বা ওয়ারপো (পানি সম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা) পরিচালিত প্রাক-সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষায় কুষ্টিয়ার ঠাকুরবাড়ি এবং রাজবাড়ীর পাংশা এলাকাকে সম্ভাব্য প্রকল্প এলাকা হিসেবে সুপারিশ করা হয়।
২০০৫ সালে প্রকল্পটির বিস্তারিত সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা (ফিজিবিলিটি স্টাডি) অনুমোদিত হয়। এরপর দেশি-বিদেশি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে ২০১৩ সালে চূড়ান্ত সমীক্ষা সম্পন্ন হয়। এই সমীক্ষা কার্যক্রমে চারটি দেশীয় ও তিনটি আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং পাঁচটি দেশীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান যুক্ত ছিল। প্রাপ্ত সুপারিশের ভিত্তিতে তৈরি করা নকশাটি বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ড দ্বারা যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। পরবর্তী সময়ে সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের কারিগরি কমিটির পুঙ্খানুপুঙ্খ পর্যালোচনা ও মতামতের ভিত্তিতে এই নকশা চূড়ান্ত রূপ পায়।
২০১১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত সংগৃহীত কৃত্রিম উপগ্রহের (স্যাটেলাইট) চিত্র এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে যে, প্রস্তাবিত এলাকার নদীতীরগুলো বেশ স্থিতিশীল রয়েছে। এছাড়া সেখানে নতুন চর জেগে ওঠার ফলে ব্যারেজ নির্মাণের পরিবেশগত ও প্রযুক্তিগত অবস্থান বর্তমানে বেশ অনুকূলে রয়েছে। তবে পদ্মার মতো একটি প্রমত্তা ও পরিবর্তনশীল নদীর গতি-প্রকৃতির বিষয়টি বিবেচনা করে যেকোনো ধরনের ভূ-প্রাকৃতিক বা জল-আকৃতিবিদ্যা সংক্রান্ত (হাইড্রো-মরফোলজিক্যাল) পরিবর্তন মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
মন্ত্রী আরও জানান, প্রকল্পের যেকোনো কারিগরি জটিলতা নিরসন এবং নকশা হালনাগাদের জন্য বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) একজন অবসরপ্রাপ্ত খ্যাতিমান পানি বিশেষজ্ঞের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের বিশেষজ্ঞ প্যানেল (বিশেষজ্ঞ দল) গঠন করা হয়েছে। একই সাথে দেশি ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগের প্রক্রিয়াও সচল রাখা হয়েছে, যাতে প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হয়।