নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন ও রাষ্ট্র সংস্কারের লক্ষ্য নিয়ে গঠিত নির্বাচিত সরকারের প্রথম ১০০ দিনের অর্জনের খতিয়ান প্রকাশ করা হয়েছে। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের নেওয়া বহুমুখী দৃশ্যমান পদক্ষেপ ও ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সংবাদমাধ্যমের সামনে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও মুখপাত্র মাহদী আমিন।
সরকারের ‘১০০ দিন পূর্তি’ উপলক্ষে আয়োজিত এই সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে জানানো হয়, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই প্রতিটি অগ্রাধিকারভিত্তিক নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার ফলে পুরো রাষ্ট্রকাঠামো সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নিয়ে একযোগে কাজ করে যাচ্ছে।
লিখিত তথ্যানুযায়ী, ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকে ২৪ মে পর্যন্ত মন্ত্রিসভার মোট ১০টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ৬০টি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়, যার মধ্যে ইতিমধ্যে ৩৭টি সিদ্ধান্ত (প্রায় ৬২ শতাংশ) বাস্তবায়িত হয়েছে এবং অবশিষ্ট ২৩টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে।
সামাজিক নিরাপত্তা ও কৃষি খাতের অগ্রগতি তুলে ধরে সম্মেলনে জানানো হয়, সরকারের প্রথম মাসেই ‘ফ্যামিলি কার্ড’ চালুর মাধ্যমে নারীকেন্দ্রিক সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে। এছাড়া ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খতিবদের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্মানী প্রদানের কার্যক্রম শুরু হয়েছে। সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে প্রিপেইড (পূর্বপরিশোধিত) বিদ্যুৎ মিটারের অতিরিক্ত মাসিক চার্জ প্রত্যাহার করা হয়েছে। প্রথম মন্ত্রিসভা বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ক্ষুদ্র কৃষকদের ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত কৃষিঋণ সুদসহ মওকুফ এবং ‘কৃষক কার্ড’ চালু করা হয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতি সচল করতে দেশজুড়ে ঐতিহাসিক খাল খনন কর্মসূচি পুনরুজ্জীবিত করার পাশাপাশি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জন্য পদ্মা ব্যারাজ প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা প্রসঙ্গে জানানো হয়, সাম্প্রতিক সময়ে দেশে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৭১ শতাংশে নেমে এসেছে। আর্থিক শৃঙ্খলা ফেরাতে এস আলম গ্রুপের ৪ হাজার ২৬৪ কোটি টাকার স্থাবর সম্পদ সফলভাবে জব্দ করা হয়েছে। একই সাথে সফলভাবে ৯০ দশমিক ৬৬ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করা হয়েছে। বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ফিরিয়ে আনতে ১০টি দেশের মধ্যে ইতিমধ্যে তিনটি দেশের সঙ্গে ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আস্থায় দেশে মাসিক রেমিট্যান্স বা প্রবাসী আয় প্রায় ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে। প্রবাসীদের সুবিধার্থে ‘প্রবাসী কার্ড’ চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তাছাড়া বন্ধ হয়ে যাওয়া কলকারখানা পুনরায় চালু করতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ তহবিল ঘোষণা করা হয়েছে।
শিক্ষা ও প্রযুক্তির উন্নয়নে সরকার বেশ কিছু উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিয়েছে। স্নাতক পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের শিক্ষা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে করা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায় থেকে সব শিক্ষার্থীর মাঝে স্কুল ড্রেস, জুতা এবং পাটের তৈরি স্কুলব্যাগ বিতরণের পরীক্ষামূলক প্রকল্প আগামী জুলাই মাসে দেশের প্রতিটি উপজেলার একাধিক স্কুলে একযোগে শুরু হবে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তুলতে আগামী মাস থেকে ‘স্টার্ট-আপ ফান্ড’ বা নতুন উদ্যোগ তহবিল কার্যকর হবে। এছাড়া দেশের প্রায় দুই লাখ ফ্রিল্যান্সার বা মুক্তপেশাজীবীকে দেওয়া হচ্ছে রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্র।
আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠায় অগ্রগতির উদাহরণ হিসেবে সংবাদ সম্মেলনে শিশু রামিসা হত্যাচেষ্টার দ্রুত অভিযোগপত্র দাখিল, মেহেরপুরে শিশু ধর্ষণের মামলায় মাত্র ২৯ কার্যদিবসের মধ্যে মৃত্যুদণ্ডের রায় এবং এক দশক পর দেশজুড়ে আলোচিত তনু হত্যা মামলার প্রথম আসামিকে গ্রেফতারের বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। এছাড়া ছাত্র-জনতার আন্দোলনের বীরদের আইনি সুরক্ষা দিতে জাতীয় সংসদে ‘জুলাই যোদ্ধাদের দায়মুক্তি আইন’ পাস করা হয়েছে। আন্দোলনে আহত শতাধিক যোদ্ধাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রাশিয়া ও সিঙ্গাপুরসহ বিভিন্ন দেশে পাঠানো হয়েছে।
যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া পর্যন্ত অর্থনৈতিক করিডোর বা অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং আগামী ১৬ ডিসেম্বরের মধ্যে হযরত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালের উদ্বোধনের লক্ষ্য নিয়ে কাজ চলছে। ঢাকার বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণে ২৫০টি পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক বাস চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া মেট্রোরেল ও ট্রেনে প্রবীণ এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য ভাড়ার ওপর ২৫ শতাংশ ছাড় ইতিমধ্যে কার্যকর করা হয়েছে।
সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অত্যাধুনিক ‘গ্রাউন্ড মাস্টার-৪০০’ রাডার স্থাপন করা হয়েছে, যা ঢাকা থেকে ৬৫০ কিলোমিটার এবং বঙ্গোপসাগরে ৮৩৩ কিলোমিটার পর্যন্ত আকাশসীমা নজরদারিতে রাখছে। পাশাপাশি সীমান্তে ড্রোন, অ্যান্টি-ড্রোন ও মাইন ডিটেক্টর বা খনি শনাক্তকারী ব্যবস্থা স্থাপনের মতো আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশি পাসপোর্টে পূর্বের ‘ইসরায়েল ব্যতীত’ শব্দবন্ধটি পুনর্বহালের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে আরও জানানো হয়, আগামী এক বছরকে ‘নজরুল বর্ষ’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ভিভিআইপি বা অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের জন্য নির্ধারিত প্রটোকলের গণ্ডি ভেঙে প্রধানমন্ত্রী সাধারণ মানুষের দুয়ারে পৌঁছাচ্ছেন। ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে উন্নীত করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার এগিয়ে যাচ্ছে। সংবাদ সম্মেলনে সরকারের প্রেস উইংয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
একটি গণতান্ত্রিক সরকারের প্রথম ১০০ দিন সাধারণত তাদের ভবিষ্যৎ শাসনব্যবস্থা ও সংস্কার পরিকল্পনার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। আলোচ্য সময়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সুশাসন নিশ্চিতে নেওয়া পদক্ষেপগুলো ইতিবাচক অগ্রগতি নির্দেশ করছে। তবে নির্বাচনি প্রতিশ্রুতিগুলোর টেকসই বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা এবং উচ্চাভিলাষী অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা আগামী দিনগুলোতে সরকারের জন্য একটি অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হবে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন ও দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার কতটা কার্যকর হয়, তা-ই এখন দেখার বিষয়।