দেশের জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফেরাতে এবং তেলের অবৈধ মজুত ও পাচার রোধে বড় ধরনের বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে সরকার। এখন থেকে সাধারণ গ্রাহকদের একটি বিশেষ প্রযুক্তিভিত্তিক অ্যাপ বা মুঠোফোন অ্যাপ্লিকেশনের মাধ্যমে জ্বালানি তেল সংগ্রহ করতে হবে, যাতে প্রতিটি ফোঁটা তেলের সঠিক হিসাব ও ব্যবহার সরকারের নজরদারিতে থাকে।
মঙ্গলবার সচিবালয়ের তথ্য অধিদপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে বর্তমান সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কার্যক্রম ও সমসাময়িক নানা জাতীয় ইস্যুতে সাংবাদিকদের সাথে কথা বলেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় বিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। সেখানে তিনি জ্বালানি সংকট, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে সরকারের ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা বিস্তারিত তুলে ধরেন।
উপদেষ্টা জানান, বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির আকাশচুম্বী মূল্যের কারণে অনেক উন্নত দেশ হিমশিম খেলেও বাংলাদেশ সরকার এখন পর্যন্ত তেলের দাম বাড়ায়নি। তবে আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা বিবেচনায় রেখে আগামী মাসে মূল্য সমন্বয় (বাজারদরের সাথে দামের সামঞ্জস্য বিধান) করা হবে কি না, তা সম্পূর্ণ পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন যে, দেশে বর্তমানে জ্বালানি তেলের যতটুকু সরবরাহ রয়েছে, তাতে লম্বা লাইনে দাঁড়িয়ে তেল কেনার মতো ভয়াবহ কোনো সংকটের কারণ নেই। মূলত এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী তেলের অবৈধ মজুত গড়ে তুলছে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতে তেল পাচারের অপচেষ্টা চালাচ্ছে বলেই বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে।
এই অসাধু চক্রকে রুখে দিতেই সরকার ‘জ্বালানি তেল ক্রয় অ্যাপ’ চালুর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, “এই অ্যাপের মাধ্যমে তেল কেনা বাধ্যতামূলক করা হবে। এর ফলে কে, কখন, কোথা থেকে কতটুকু তেল কিনছেন—সব তথ্য সরকারি তথ্যভাণ্ডারে সংরক্ষিত থাকবে। এতে করে একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বারবার তেল কিনে মজুত করতে পারবে না এবং পাচারের পথও রুদ্ধ হবে।”
শহরের যাতায়াত ব্যবস্থা ও জননিরাপত্তা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান অটোরিকশা নিয়ে সরকারের উদ্বেগের কথা জানান। তিনি বলেন, বর্তমানে শহরগুলোতে যেভাবে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে অটোরিকশা চলাচল করছে, তা জনজীবনের জন্য বিপজ্জনক হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই যানবাহনের কোনো যান্ত্রিক সক্ষমতা বা ফিটনেস (চলাচলের উপযুক্ততা) পরীক্ষা করা হয় না এবং চালকদেরও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ নেই। ফলে প্রতিনিয়ত বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটছে। সরকার এই বিপজ্জনক যানবাহনের বিকল্প এবং একটি সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে গুরুত্বের সাথে ভাবছে।
দেশের অর্থনৈতিক অবস্থান নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়ে উপদেষ্টা বলেন, স্বল্পোন্নত দেশের (যাদের অর্থনীতি এখনো বিকাশমান পর্যায়ে রয়েছে) তালিকা থেকে বাংলাদেশের চূড়ান্ত উত্তরণ আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। বর্তমান বৈশ্বিক টালমাটাল পরিস্থিতি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক মন্দার কারণে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে এলডিসি বা স্বল্পোন্নত দেশ থেকে বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত প্রস্তুত নয়। তাই সরকার এই মুহূর্তে উত্তরণের পরিকল্পনা থেকে সরে এসেছে এবং স্থিতিশীলতা অর্জনে মনোযোগ দিচ্ছে।
সরকারের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার প্রসঙ্গে তিনি জানান, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়কালে কোনো প্রকার দুর্নীতি হয়েছে কি না, তাও কঠোরভাবে খতিয়ে দেখা হবে। তবে এই প্রক্রিয়াটি শুরু হবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সম্পূর্ণভাবে পুনর্গঠন করার পর। প্রতিষ্ঠানটি পুনর্গঠিত হলে তবেই তদন্ত কার্যক্রম গতিশীল হবে এবং প্রকৃত দোষীদের চিহ্নিত করা সম্ভব হবে।
জনস্বাস্থ্য নিয়ে কথা বলতে গিয়ে ডা. জাহেদ উর রহমান দেশে সাম্প্রতিক হামের প্রাদুর্ভাব ও টিকা সংকট নিয়ে দুঃখ প্রকাশ করেন। তিনি এই সংকটের জন্য সরাসরি বিগত সরকারের গাফিলতিকে দায়ী করেন। তিনি বলেন, “আগের সরকারের সময়মতো টিকা সংগ্রহের উদ্যোগের অভাবেই আজ শিশুদের জীবন ঝুঁকিতে পড়েছে। হামে আক্রান্ত হয়ে শিশুদের মৃত্যু অত্যন্ত হৃদয়বিদারক।” এই সংকট মোকাবিলায় সরকার ইতিমধ্যেই ঝুঁকিপূর্ণ ৩০টি এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে টিকা কার্যক্রম শুরু করেছে। আগামী ৩ মে থেকে সারা দেশে ব্যাপক আকারে এই টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেন।
জ্বালানি তেল কেনায় ডিজিটাল পদ্ধতির ব্যবহার একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হতে পারে, যদি এর সঠিক প্রয়োগ নিশ্চিত করা যায়। তবে শুধুমাত্র প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাচার বা মজুত রোধ করা কতটা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে মাঠ পর্যায়ের প্রশাসনের কঠোর নজরদারির ওপর। অন্যদিকে, স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উত্তরণ পিছিয়ে যাওয়া আমাদের অর্থনীতির বর্তমান নাজুক অবস্থাকেই নির্দেশ করে। দুর্নীতি দমন কমিশন পুনর্গঠন এবং স্বাস্থ্য খাতের সংকট নিরসনে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপগুলো কত দ্রুত দৃশ্যমান হয়, সাধারণ মানুষ এখন সেদিকেই তাকিয়ে আছে। রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ স্তর থেকে দুর্নীতির তদন্ত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা যদি সফল হয়, তবে তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন নজির স্থাপন করবে।