জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) সংগীত বিভাগের তরুণী শিক্ষার্থী প্রত্যাশা মজুমদার অথৈয়ের মর্মান্তিক আত্মহত্যার পেছনে তার প্রেমিক ইয়াছিন মজুমদারের ধারাবাহিক ‘মানসিক নিপীড়ন ও অপমান’কে দায়ী করে আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) জমা দিয়েছে পুলিশ। তদন্তকারী কর্মকর্তার দেওয়া এই অভিযোগপত্রটি ঢাকার একটি মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রহণ করে মামলাটি বিচার প্রক্রিয়ার জন্য বদলির নির্দেশ দিয়েছেন।
আদালত ও মামলা সূত্রে জানা যায়, গত বছরের ২৯ এপ্রিল পুরান ঢাকার সূত্রাপুরের লক্ষ্মীবাজারের নন্দলাল লেনের একটি মেস কক্ষ থেকে অথৈয়ের ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। এই ঘটনায় মেয়েকে আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগ এনে পরদিনই সূত্রাপুর থানায় মামলা দায়ের করেন অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার। মামলার পরপরই লালবাগের একটি রেস্তোরাঁর কর্মী আসামি ইয়াছিনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। পরবর্তীতে তিনি আদালত থেকে জামিনে মুক্ত হলেও নিয়মিত হাজিরা না দেওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সূত্রাপুর থানার পুলিশ উপ-পরিদর্শক (এসআই) আলমগীর হোসেন জানান, নিবিড় তদন্ত শেষে আসামি ইয়াছিনের বিরুদ্ধে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র জমা দেওয়া হয়েছে। অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, অথৈ ও ইয়াছিনের বাড়ি চট্টগ্রামে এবং তারা একই স্কুলে পড়াশোনা করতেন। ইয়াছিন বিভিন্ন সময় তাকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে উত্যক্ত করতেন। পরবর্তীতে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে ২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে অথৈ জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগে ভর্তি হয়ে ঢাকায় মেস নিয়ে থাকতে শুরু করেন। কিন্তু ইয়াছিনও ঢাকায় চলে আসেন এবং লালবাগের একটি রেস্তোরাঁয় চাকরি নিয়ে অথৈয়ের ওপর মানসিক চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন।
পরবর্তীতে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে উঠলেও ইয়াছিন প্রায়ই কুৎসিত অপবাদ ও অপমানজনক কথাবার্তা বলে অথৈকে মানসিক যন্ত্রণায় রাখতেন। ঘটনার দিন ২৯ এপ্রিল বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সংগীত উৎসবের অনুশীলন শেষে মেসে ফিরছিলেন অথৈ। মেসের ফটকে আগে থেকে দাঁড়িয়ে থাকা ইয়াছিন তাকে অনুষ্ঠানে অংশ নিতে বারণ করেন এবং প্রকাশ্যে চরম গালমন্দ করেন। পুলিশ জানায়, ইয়াছিনের এই অপমান সহ্য করতে না পেরে নিজ কক্ষে গিয়ে গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেন অথৈ।
এদিকে বাদীপক্ষের আইনজীবী সুমন কুমার রায় দাবি করেন, অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক প্রতিবেদনে ইয়াছিনের মুঠোফোনে কিছু অন্তরঙ্গ ছবি পাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে, যা দিয়ে অথৈকে ভয় দেখিয়ে মানসিক অত্যাচার করা হতো। তবে তদন্ত কর্মকর্তা আলমগীর হোসেন জানান, তার তদন্তে এমন কোনো ছবির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। অন্যদিকে আসামিপক্ষের আইনজীবী মোহাম্মদ আবু বক্কর ছিদ্দিক ছবি থাকার বিষয়টি অসত্য দাবি করে জানান, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে আসামি ইয়াছিন কিছুদিন আগে মারা গেছেন, যা আগামী ধার্য তারিখে আদালতকে অবহিত করা হবে।
একমাত্র ছোট মেয়েকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন অথৈয়ের বাবা প্রণব মজুমদার। তিনি কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “মেয়েটাকে নিয়ে আমার কত শত স্বপ্ন ছিল। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করার পর তাকে ভারতের রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু অপরাধীদের কারণে সেই আশা চিরতরে শেষ হয়ে গেল। যে আমার মেয়েকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিল, আমি আইনের কাছে তার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”