২০২৪ সালের ঐতিহাসিক জুলাই-আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের বীর শহীদদের স্মরণে এবং আন্দোলনের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাসকে ধরে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি ধারাবাহিক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সরকার। আগামী ১৫ জুলাই থেকে শুরু হয়ে এই কর্মসূচি চলবে ৫ আগস্ট পর্যন্ত। এই ২০ দিন ধরে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে স্মরণসভা, আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনী, স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন এবং বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
রোববার (৫ জুলাই) মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে এসব কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করেন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার ইশরাক হোসেন।
প্রতিমন্ত্রী জানান, আগামী ৫ আগস্ট ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস ২০২৬’ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় পালন করা হবে। এই উপলক্ষে ঢাকার শেরেবাংলা নগরে অবস্থিত চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এক বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে, যেখানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন প্রধানমন্ত্রী। ঐতিহাসিক এই অনুষ্ঠানে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণআন্দোলনে শহীদ হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার এবং গুরুতর আহতদের বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হবে। ৫ আগস্ট ভোর ৬টায় শাহবাগে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে দিবসের কর্মসূচি শুরু হবে। অনুষ্ঠানে আন্দোলনের সময় ছাত্র-জনতার ওপর চালানো নৃশংস হামলা ও নির্মম হত্যাকাণ্ডের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হবে। এছাড়া শহীদ ও আহত পরিবারের সদস্যরা সেখানে তাঁদের স্মৃতিচারণামূলক বক্তব্য পেশ করবেন।
সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, আগামী ১৬ জুলাই দেশব্যাপী ‘জুলাই শহীদ দিবস’ হিসেবে পালন করার নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী বলেন, ওই দিন রংপুরে আবু সাঈদ এবং কক্সবাজারে ওয়াসিম আকরামের শাহাদাতের পর গণআন্দোলনের তীব্রতা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছিল এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করে। এই বিশেষ দিনটিতে রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে শহীদ আবু সাঈদের স্মরণে এবং কক্সবাজারের পেকুয়ায় শহীদ ওয়াসিম আকরামের স্মরণে পৃথক দুটি স্মৃতিস্তম্ভের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হবে। রংপুরের অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আজম খান এবং কক্সবাজারের অনুষ্ঠানে প্রতিমন্ত্রী ইশরাক হোসেন স্বশরীরে উপস্থিত থাকবেন।
এর আগে ১৫ জুলাই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসগুলোতে চালানো হামলার প্রতিবাদে এক বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর আয়োজন করা হবে। ২০২৪ সালের এই দিনে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের ওপর ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠন ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা একযোগে হামলা চালিয়েছিল। বিশেষ করে নারী শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা ছিল তীব্র। সেই দিনটির স্মরণে আয়োজিত এই প্রদর্শনীর নাম নির্ধারণ করা হতে পারে ‘ক্যাম্পাসের ক্ষতচিহ্ন’ অথবা ‘প্রতিরোধের সূচনা’। এই প্রদর্শনীটি শাহবাগ চত্বর, চারুকলা ইনস্টিটিউট অথবা জাতীয় জাদুঘরের উন্মুক্ত স্থানে অনুষ্ঠিত হবে।
এছাড়া, আন্দোলনের অন্যতম মোড় পরিবর্তনকারী দিন ১৮ জুলাইকে ‘প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি রেজিস্ট্যান্স ডে’ (বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিরোধ দিবস) হিসেবে পালন করা হবে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনের ওপর দমনপীড়ন নেমে আসার পর ১৮ জুলাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে নেমে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, যেখানে চারজন শিক্ষার্থী শহীদ হন। এই প্রতিরোধকে স্মরণ করতে ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে (সেনাবাহিনী ক্রীড়াঙ্গন) একটি ছাত্র সমাবেশ ও প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
কর্মসূচির অংশ হিসেবে আগামী ২৪ জুলাই রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এক বিশেষ স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হবে। উল্লেখ্য, ২৪ জুলাই যাত্রাবাড়ী এলাকা থেকে চট্টগ্রাম মহাসড়ক পর্যন্ত দীর্ঘ পথ অবরোধ করে স্থানীয় বাসিন্দা, সাধারণ ছাত্র-জনতা ও মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা এক অভূতপূর্ব প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে প্রায় ৮০ জন মানুষ শহীদ হন। তাঁদের আত্মত্যাগকে চিরস্মরণীয় করে রাখতেই যাত্রাবাড়ীতে এই সমাবেশের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।