কক্সবাজারের টেকনাফ উপকূলে গভীর সমুদ্রে যৌথ অভিযান চালিয়ে একটি ট্রলার থেকে পাচারের শিকার ৫০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ কোস্ট গার্ড। উদ্ধারকৃতদের প্রলোভন দেখিয়ে ও অপহরণ করে সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচারের উদ্দেশ্যে ট্রলারে জড়ো করা হয়েছিল। এই চক্রের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে আন্তর্জাতিক মানবপাচারকারী দলের ৯ জন সক্রিয় সদস্যকে হাতেনাতে আটক করা হয়েছে।
কোস্ট গার্ড টেকনাফ স্টেশনের কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মো. মুত্তাকিন সিদ্দিকী গতকাল শনিবার দুপুরে এক সংবাদ সম্মেলনে এই চাঞ্চল্যকর অভিযানের বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরেন। তিনি জানান, গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত টেকনাফ ও বাহারছড়া সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় কোস্ট গার্ডের বিশেষ জাহাজ ‘মনসুর আলী’, শাহপরী দ্বীপ ফাঁড়ি ও বাহারছড়া আউটপোস্টের সদস্যদের সমন্বয়ে একটি বিশেষ যৌথ অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযান চলাকালীন বাহারছড়া সংলগ্ন সমুদ্রসীমায় একটি সন্দেহভাজন কাঠের বড় নৌকাকে (ট্রলার) চলতে দেখে কোস্ট গার্ডের টহল দল সেটিকে থামার নির্দেশ দেয়। কিন্তু নৌকায় থাকা মাঝিমাল্লারা নির্দেশ অমান্য করে দ্রুত গভীর সমুদ্রের দিকে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। কোস্ট গার্ডের সদস্যরা তখন ধাওয়া করে নৌকাটিকে ঘেরাও করে নিয়ন্ত্রণে নেন।
নৌকাটি আটকের পর তল্লাশি চালিয়ে ভেতর থেকে অত্যন্ত মানবেতর অবস্থায় থাকা ৫০ জন ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে ১১ জন মিয়ানমারের বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত নাগরিক বা রোহিঙ্গা এবং বাকি ৩৯ জন বাংলাদেশের বিভিন্ন প্রান্তিক জেলার বাসিন্দা। কোস্ট গার্ডের প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে ফুসলিয়ে আনা হয়েছিল। তবে তাৎক্ষণিকভাবে উদ্ধার হওয়া সাধারণ ভুক্তভোগী এবং আটককৃত পাচারকারীদের বিস্তারিত নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়নি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে তাদের স্থানীয় থানায় হস্তান্তর করার কাজ চলছে।
আটককৃত চক্রের সদস্যদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে মানবপাচারের লোমহর্ষক তথ্য বেরিয়ে এসেছে। লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মুত্তাকিন সিদ্দিকী বলেন, এই চক্রটি মূলত দরিদ্র ও কর্মহীন তরুণদের টার্গেট করে। মালয়েশিয়ায় উচ্চ বেতনে চাকরি, নিশ্চিত কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবনযাপনের স্বপ্ন দেখিয়ে তাদের সীমান্ত এলাকা টেকনাফে নিয়ে আসা হতো। তবে তাদের আসল উদ্দেশ্য কেবল পাচার করাই ছিল না। টেকনাফের দুর্গম পাহাড়ি এলাকার বিভিন্ন গোপন আস্তানায় ভুক্তভোগীদের কয়েক দিন হাত-পা বেঁধে আটকে রাখা হতো। সেখানে তাদের ওপর অমানবিক শারীরিক নির্যাতন চালানো হতো এবং পরিবারের কাছ থেকে ফোন করিয়ে বিপুল অঙ্কের মুক্তিপণ আদায় করা হতো।
তদন্তে আরও জানা গেছে যে, উদ্ধার হওয়াদের মধ্যে বেশ কয়েকজনকে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে সরাসরি অপহরণ করা হয়েছিল। মুক্তিপণ আদায়ের পাশাপাশি অতিরিক্ত মুনাফা করার আশায় তাদের জোরপূর্বক এই ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। খাবারহীন ও রুদ্ধদ্বার ট্রলারে করে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হতো এই অসহায় মানুষদের। কোস্ট গার্ডের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, উদ্ধার হওয়া ভুক্তভোগীদের মানবিক সাহায্য ও প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পাশাপাশি আইনি প্রক্রিয়া শুরুর কাজ প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। একই সঙ্গে আটককৃত ৯ পাচারকারীর বিরুদ্ধে মানবপাচার প্রতিরোধ ও দমন আইনে টেকনাফ মডেল থানায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে। সমুদ্রকে অপরাধমুক্ত রাখা এবং এ ধরনের অমানবিক পাচার পুরোপুরি বন্ধ করতে কোস্ট গার্ডের টহল ও বিশেষ অভিযানগুলো আগামী দিনগুলোতে আরও জোরদার করা হবে।
কক্সবাজারের সমুদ্র উপকূলীয় অঞ্চল ব্যবহার করে বছরের পর বছর ধরে মানবপাচারের এই ধারা অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়। রোহিঙ্গা সংকটের পর থেকে এই পাচারকারী চক্রগুলো আরও বেশি সক্রিয় হয়ে উঠেছে। টেকনাফে কোস্ট গার্ডের এই সাম্প্রতিক সফল অভিযান প্রশংসনীয় হলেও এটি আসলে একটি গভীর সংকটের আংশিক চিত্র মাত্র। সাগর শান্ত থাকার মরশুমগুলোতে দালাল চক্রের এই তৎপরতা বহুগুণ বেড়ে যায়। শুধু সামুদ্রিক অভিযান দিয়ে মানবপাচারের মতো জটিল অপরাধ নির্মূল করা অসম্ভব, যদি না স্থানীয় রাজনৈতিক পরোক্ষ মদদদাতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা যায়। একই সাথে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা জোরদার করা জরুরি, যাতে অভাবের তাড়নায় কেউ এভাবে অনিশ্চিত মৃত্যুর সাগরে ঝাঁপ না দেয়।