Logo
ট্রেন্ডিং: হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সহস্রাধিক যুবলীগ চেয়ারম্যান পরশ ও স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ আর কখনও কারও কাছে মাথা নত করবে না: সংসদে খলিলুর নেপাল সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা: নিহত ৩৩০, নিখোঁজ সহস্রাধিক

ঢাকার পাড়া-মহল্লায় ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি, ঘরে ঘরে সম্প্রীতি ও ঈদের আনন্দ

Roksana
29 August 2026, 02:08 AM পড়তে ১ মিনিট
ঢাকার পাড়া-মহল্লায় ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি, ঘরে ঘরে সম্প্রীতি ও ঈদের আনন্দ

পবিত্র ঈদুল আজহার নামাজ শেষ হতে না হতেই রাজধানী ঢাকার অলিগলি, পাড়া-মহল্লা ও ভবনের নিচতলায় শুরু হয়েছে পশু কোরবানির মহাব্যস্ততা। ত্যাগের মহিমায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায় পশু জবাই করছেন, যা নগরজুড়ে এক উৎসবমুখর, আনন্দঘন ও ভ্রাতৃত্ববোধের পরিবেশ সৃষ্টি করেছে।


পবিত্র ঈদুল আজহা বা কোরবানির ঈদ উপলক্ষে রাজধানী ঢাকার দৃশ্যপট যেন পুরোপুরি পাল্টে গেছে। বৃহস্পতিবার সকালে ঈদের নামাজ আদায়ের পরপরই নগরবাসী মেতে ওঠেন পশু কোরবানির পরম আনন্দে। মহান আল্লাহর নৈকট্য ও সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে সামর্থ্যবান ধর্মপ্রাণ মুসলমানরা পশু কোরবানি দিচ্ছেন। ঢাকার প্রতিটি অলিগলি, পাড়া-মহল্লা, প্রশস্ত সড়ক, আবাসিক এলাকা থেকে শুরু করে বহুতল অট্টালিকার (বড় ভবন) নিচতলা—সবখানেই এখন ত্যাগের এই উৎসবের চিত্র। সকাল থেকেই পশু জবাই ও মাংস প্রস্তুত করার মহাব্যস্ততায় সময় পার করছেন সাধারণ নগরবাসী।

রাজধানীর রামপুরা এলাকার জামতলা গলিতে গিয়ে দেখা যায় এক চিরচেনা উৎসবের রূপ। সেখানে কয়েকজন তরুণ ও যুবক মিলে একটি বড় গরু জবাইয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তাদের ঘিরে দাঁড়িয়ে আছেন শিশু-কিশোরসহ নানা বয়সী মানুষ। সবার চোখেমুখেই এক অন্যরকম উচ্ছ্বাস ও আনন্দ। স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ মহিউদ্দিন কোরবানির মূল তাৎপর্য তুলে ধরে বলেন, “কোরবানি মানে কেবল একটি পশুর রক্ত প্রবাহিত করা নয়, এটি মূলত মানুষের মনের ভেতরের অহংকার ও স্বার্থপরতা ত্যাগের মহান শিক্ষা দেয়। আমরা প্রতি বছর পরিবারের সবাই একত্রিত হয়ে কোরবানি দিই। এতে আত্মীয়স্বজন এবং প্রতিবেশীদের মধ্যে সম্পর্ক ও পারস্পরিক ভালোবাসা আরও অনেক বেশি দৃঢ় হয়।”

ঈদের এই আনন্দ সবচেয়ে বেশি ছুঁয়ে যায় কোমলমতি শিশুদের মনকে। রামপুরার আরেক বাসিন্দা শারমিন আক্তার হাসিমুখে বলেন, “বাচ্চারা সকাল থেকেই দারুণ আনন্দ করছে। তারা নতুন পোশাক পরে গরুর চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে, মাংস কাটার কাজ অবাক হয়ে দেখছে। শহুরে যান্ত্রিক জীবনে ঈদের এই কোলাহলপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বছরে মাত্র একবারই আসে, যা শিশুদের মানসিক বিকাশেও বড় ভূমিকা রাখে।”

এদিকে, বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও সামাজিক ঐক্যের কারণে যৌথভাবে বা ভাগে (অংশীদারত্বের ভিত্তিতে) কোরবানি দেওয়ার প্রবণতা বেশ বেড়েছে। শফিকুল ইসলাম নামের এক ব্যক্তি জানান, এবার কয়েকটি পরিবার মিলে যৌথভাবে একটি বড় গরু কোরবানি দিচ্ছেন তারা। তিনি বলেন, “আগে সবাই যার যার মতো আলাদাভাবে কোরবানি দিত। তবে এবার আমার মতো অনেকেই একসঙ্গে পশু কিনে কোরবানি করছেন। এতে যেমন ব্যক্তিগত খরচ কিছুটা কমে আসে, তেমনি সবার একসঙ্গে কাজ করার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী সামাজিক বন্ধনও তৈরি হয়।”

রাজধানীর মিরপুর এলাকা থেকে মো. আশিকুর রহমান আশিক নামের আরেকজন জানান, সকাল সাতটায় ঈদের জামাত (সম্মিলিত নামাজ) শেষ করেই তিনি পশু কোরবানির কাজে লেগে পড়েছেন। এবার তারা চারজন মিলে যৌথভাবে একটি গরু কোরবানি দিচ্ছেন। তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে অনেকেই অন্তর্জাল বা যোগাযোগ প্রযুক্তির সহায়তায় দূর থেকে পশু কোরবানি দিলেও আশিকুর রহমান তা খুব একটা পছন্দ করেন না। তিনি মনে করেন, “নিজের চোখের সামনে কোরবানির পশুর কাছে উপস্থিত না থাকলে মনে সেই আধ্যাত্মিক শান্তি পাওয়া যায় না। বাসার সামনে কোরবানি হচ্ছে দেখে পরিবারের শিশুরা অনেক আনন্দ পাচ্ছে। মহান আল্লাহ যেন আমাদের এই ত্যাগ ও কোরবানি কবুল করেন, সেই দোয়াই করছি।”

পশু কোরবানির এই দিনে সবচেয়ে বেশি ব্যস্ততা দেখা যায় পেশাদার মাংস প্রস্তুতকারীদের (যাদের সাধারণত কসাই বলা হয়)। ভোর থেকে শুরু করে গভীর রাত পর্যন্ত তাদের দম ফেলার ফুরসত থাকে না। রিপন মিয়া নামের এক পেশাদার মাংস প্রস্তুতকারী জানান, সকাল সাতটার পর থেকেই তিনি দলবল নিয়ে কাজ শুরু করেছেন। তিনি বলেন, “আজ সারাদিনে আমাদের অন্তত সাতটা গরু জবাই ও মাংস কাটার কাজ শেষ করতে হবে। সারা বছর কাজ করলেও মূলত ঈদের এই কয়েক দিনেই আমাদের সবচেয়ে বেশি আয় হয়।”

জাহাঙ্গীর আলম নামের আরেকজন মাংস প্রস্তুতকারী তার চরম ব্যস্ততার কথা জানিয়ে বলেন, “আজ আমাদের অনেক চাপ। এই গরুর মাংস কাটা শেষ করেই আমাদের দ্রুত ছুটতে হবে মোল্লা বাড়ি (স্থানীয় একটি বাড়ির নাম), সেখানে তিনটি গরু কাটার চুক্তি আছে। এরপর জাকের গলিতে আরও দুটি গরুর মাংস প্রস্তুত করতে হবে। এভাবেই চলবে আজ সারাদিন।”

সব মিলিয়ে ঢাকা শহরের প্রতিটি কোণায় এখন মাংস কাটা, ভাগ করা ও বিলি করার উৎসব চলছে। কোরবানির বিধান অনুযায়ী মাংস তিন ভাগ করে এক ভাগ নিজেদের, এক ভাগ আত্মীয়স্বজন ও এক ভাগ গরিব-দুঃখীদের মাঝে বিতরণের মাধ্যমে সমাজে এক অপূর্ব সাম্যের সৃষ্টি হয়েছে। শিশু-কিশোরদের উচ্ছ্বাস এই আনন্দকে দ্বিগুণ করেছে। রামপুরার বাসিন্দা ও বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান তার অনুভূতির কথা জানিয়ে বলে, “সকালে ঈদের নামাজ পড়েই দ্রুত বাসায় চলে এসেছি। বাবা ও চাচার সঙ্গে কোরবানির গরু জবাই করা দেখেছি। এখন মাংস কাটা শেষ হলে বাবার সঙ্গে নানু ও খালার বাসায় মাংস পৌঁছে দিতে যাব।”


পশু কোরবানির এই উৎসব কেবল একটি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা নয়, এটি সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষকে এক সুতোয় গাঁথার এক অসাধারণ মাধ্যম। ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয় নির্বিশেষে সবার মাঝে কোরবানির মাংস বিতরণের যে চিরায়ত বিধান, তা আমাদের সমাজে অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্য দূর করতে শেখায়। প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করে দূরে বসে কোরবানি দেওয়ার চেয়ে নিজ হাতে বা উপস্থিত থেকে কোরবানি দেওয়া এবং নিজের হাতে তা প্রতিবেশীদের মাঝে বণ্টন করার আনন্দ সত্যিই অতুলনীয়। এই ত্যাগের মহিমা যদি আমরা সারা বছর আমাদের ব্যক্তিগত ও রাষ্ট্রীয় জীবনে ধারণ করতে পারি, তবে একটি বৈষম্যহীন, সহনশীল ও মানবিক সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
জাতীয়

ঢাকার পাড়া-মহল্লায় ত্যাগের মহিমায় পশু কোরবানি, ঘরে ঘরে সম্প্রীতি ও ঈদের আনন্দ

R
Roksana | 28 May 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার