বৈরী আবহাওয়া, অতিরিক্ত গাড়ির চাপ ও সড়কে বিকল হওয়া যানবাহনের কারণে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে ভয়াবহ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। প্রায় ৫৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে গাড়ি চলছে একেবারে ধীরগতিতে, কোথাও কোথাও পুরোপুরি থমকে আছে চাকা। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বাসে আটকে থেকে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নারী, শিশু ও বয়স্কসহ হাজারো সাধারণ যাত্রী।
মঙ্গলবার (২৬ মে) দিবাগত রাত থেকে উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিত ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়কে এক অস্বস্তিকর ও স্থবির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। যমুনা সেতুর টোল আদায় কেন্দ্র (যেখান থেকে সেতু পারাপারের জন্য নির্দিষ্ট মাশুল আদায় করা হয়) থেকে শুরু করে টাঙ্গাইল সদর উপজেলার পাকুল্ল্যা পর্যন্ত দীর্ঘ সড়কজুড়ে থেমে থেমে যানজট লেগে আছে। মহাসড়কের এই দীর্ঘ অংশে যানবাহনের চাকা যেন ঘুরতেই চাইছে না। কোথাও গাড়ি চলছে শামুকের গতিতে, আবার কোথাও ঘণ্টার পর ঘণ্টা একই জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এই আকস্মিক দুর্ভোগের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ একযোগে কাজ করেছে। প্রথমত, সড়কে ধারণক্ষমতার চেয়ে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ। দ্বিতীয়ত, হঠাৎ শুরু হওয়া বৈরী আবহাওয়া বা টানা বৃষ্টিপাত। এর পাশাপাশি যমুনা সেতু এবং এর সংযোগ সড়কে রাতের অন্ধকারে একাধিক মালবাহী গাড়ি ও যাত্রীবাহী বাস বিকল হয়ে যাওয়ার ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এছাড়া ছোটখাটো কিছু দুর্ঘটনার কারণেও যান চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
যানজটের কারণে মহাসড়কে আটকা পড়া হাজার হাজার যাত্রী অবর্ণনীয় কষ্টের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশেষ করে নারী, শিশু এবং বয়স্ক যাত্রীদের দুর্ভোগ চরমে পৌঁছেছে। বৃষ্টিভেজা আবহাওয়ায় প্রয়োজনমতো শৌচাগার ব্যবহার করতে না পারা এবং সুপেয় পানির অভাবে গাড়ির ভেতরেই হাঁসফাঁস করছেন অনেকে। দীর্ঘক্ষণ একই জায়গায় বসে থাকায় শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ বোধ করছেন। গন্তব্যে পৌঁছানোর তাগিদ যেন মাঝপথেই চরম ক্লান্তিতে পরিণত হয়েছে।
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা পরিস্থিতি দ্রুত স্বাভাবিক হওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন। যমুনা সেতু প্রকল্প কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সৈয়দ রিয়াজ উদ্দিন সংবাদমাধ্যমকে জানান, রাতের বেলা বৃষ্টির কারণে চালকদের দৃষ্টিসীমা কমে যায় এবং অতিরিক্ত গাড়ির চাপে সড়কে কিছুটা যানজট তৈরি হয়। তবে বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আটকে থাকা গাড়িগুলো সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে এবং যান চলাচল স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অন্যদিকে, টাঙ্গাইল জেলার পুলিশ সুপার মুহাম্মদ শামসুল আলম সরকারও একই ধরনের তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেন, মহাসড়কের টাঙ্গাইল অংশজুড়ে এখন যানবাহনের অস্বাভাবিক চাপ রয়েছে। মূলত বৃষ্টির কারণে সড়ক পিচ্ছিল থাকায় চালকরা সাবধানে ও ধীরগতিতে গাড়ি চালাচ্ছেন, যার প্রভাব পড়েছে পুরো মহাসড়কের ওপর। তবে মহাসড়কে দায়িত্বরত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যানজট নিরসনে নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে এবং দ্রুততম সময়ের মধ্যেই মানুষ স্বস্তিতে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে তিনি আশাবাদী।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানজট কোনো নতুন ঘটনা নয়, বিশেষ করে উৎসব বা ছুটির সময় এটি নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। তবে সামান্য বৃষ্টি বা রাতের বেলা দু-একটি গাড়ি বিকল হলেই যদি ৫৫ কিলোমিটার জুড়ে এমন দীর্ঘস্থায়ী অচলাবস্থা তৈরি হয়, তবে মহাসড়ক ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা অত্যন্ত স্বাভাবিক। মহাসড়কে বিকল হওয়া গাড়ি দ্রুত সরানোর জন্য পর্যাপ্ত শক্তিশালী উদ্ধারকারী যান (রেকার) ও তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা থাকা জরুরি। পাশাপাশি ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত গাড়ির চাপ সামলাতে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় আরও কঠোর নজরদারি ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় হাইওয়ে পুলিশের টহল আরও জোরদার হওয়া প্রয়োজন। তা না হলে সাধারণ মানুষের এই অন্তহীন পথের দুর্ভোগ কখনো শেষ হবে না এবং মহাসড়কগুলো যাত্রীদের জন্য আতঙ্কের কারণ হয়েই থাকবে।