বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক আরও জোরদার করতে এবং দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে বিনিয়োগে নতুন গতি আনতে ১৩টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে। স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার বিকেলে চীনের বেইজিংয়ের ঐতিহাসিক ‘গ্রেট হল অব দ্য পিপল’-এ বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং চীনের প্রধানমন্ত্রী লি ছিয়াংয়ের উপস্থিতিতে এই সমঝোতা স্মারকগুলো স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তি স্বাক্ষরের আগে দুই দেশের সরকারপ্রধানের নেতৃত্বে অত্যন্ত সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে এক দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে পারস্পরিক সহযোগিতার নানা দিক উঠে আসে।
বাংলাদেশের পক্ষে সমঝোতা স্মারকে সই করেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান, তথ্য ও প্রচার মন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা। বৈঠক পরবর্তী এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহ্দী আমিন চুক্তিগুলোর বিস্তারিত তুলে ধরেন। তিনি জানান, সই হওয়া সমঝোতা স্মারকগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব সবুজ উন্নয়ন (গ্রিন ডেভেলপমেন্ট) নিশ্চিত করা এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের উন্নয়নে যৌথ কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা।
মুখপাত্র মাহ্দী আমিন আরও জানান, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও অবকাঠামো খাতের উন্নয়ন ত্বরান্বিত করতে চীন থেকে নেওয়া রেয়াতি বা সহজ শর্তের ঋণের সুদের হার কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। একই সাথে ঋণ পরিশোধের অতিরিক্ত সময়সীমা বা গ্রেস পিরিয়ড (ঋণ পরিশোধের বিশেষ ছাড়ের সময়) বাড়ানোর বিষয়েও ইতিবাচক সিদ্ধান্ত এসেছে। চীনের প্রস্তাবিত ‘বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগ’ বা জিডিআই-এর আওতায় বাংলাদেশের স্বাস্থ্য, শিক্ষা এবং সামগ্রিক জনশক্তি উন্নয়ন নিয়ে দুই দেশ যৌথভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে।
কৃষি ও শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মুখপাত্র বলেন, এই নতুন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ থেকে চীনের বাজারে জাতীয় ফল কাঁঠাল রপ্তানির জন্য আনুষ্ঠানিক পথ সুগম হয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়নের অংশ হিসেবে বাংলাদেশের জাতীয় শিক্ষাক্রমে চীনা ভাষা ‘ম্যান্ডারিন’ অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর পাশাপাশি কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা সম্প্রসারণ এবং দুই দেশের গণমাধ্যম ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (থিংক ট্যাংক) সক্ষমতা বৃদ্ধিতে পৃথক সমঝোতা স্মারক সই হয়েছে।
দেশের শিল্প খাতের উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় এবং মোংলা অর্থনৈতিক অঞ্চলে চীনা বিনিয়োগ আকর্ষণ ও নতুন উৎপাদন কেন্দ্র গড়ে তোলার চুক্তি হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা)-র সাথে সম্পাদিত এই চুক্তির ফলে বাংলাদেশে নতুন চীনা কারখানা স্থাপিত হবে এবং স্থানীয় পর্যায়ে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
সরকারি পর্যায়ে এই সমঝোতার পাশাপাশি চীনের কমিউনিস্ট এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-র মধ্যেও একটি দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা চুক্তি সই হয়েছে। বেইজিংয়ের রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন ‘তিয়াওইউথাই’-এ বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপস্থিতিতে এই চুক্তিতে সই করেন দলটির যুগ্ম মহাসচিব হুমায়ুন কবির এবং চীনের কমিউনিস্ট পার্টির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মন্ত্রী লিউ হাইসিং। এর মাধ্যমে দুই দেশের জনগণের মধ্যে নিবিড় যোগাযোগের নতুন পথ উন্মুক্ত হবে।
নতুন মেয়াদে সরকার গঠনের পর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় বিদেশ সফর। এর আগে ২১ জুন তিনি মালয়েশিয়া সফরে যান এবং সেখান থেকে সরাসরি চীনের ডালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের সম্মেলনে যোগ দেন। সফরসূচি অনুযায়ী, আজ শুক্রবার চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সাথে এক বিশেষ দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে মিলিত হবেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। এরপর বেইজিং সময় বিকেলে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবেন তিনি।