ময়মনসিংহের ত্রিশালে সাড়ে চার দশক আগে খনন করা ঐতিহাসিক ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কাজের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। শনিবার দুপুরে ফলক উন্মোচনের মাধ্যমে এই কর্মসূচির সূচনা করা হয়, যা স্থানীয় কৃষি ও পরিবেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ: ময়মনসিংহের ত্রিশাল উপজেলার বৈলর ইউনিয়নে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী ‘ধরার খাল’ পুনরায় সচল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। শনিবার দুপুর আড়াইটার দিকে এক বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে এই পুনঃখনন কাজের ফলক উন্মোচন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ৩ দশমিক ১ কিলোমিটার দীর্ঘ এই খালটি দীর্ঘদিনের অবহেলা ও পলি জমে ভরাট হয়ে মৃতপ্রায় অবস্থায় পৌঁছেছিল। বর্তমান সরকারের জলাশয় ও খাল খনন কর্মসূচির অংশ হিসেবে এই গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগটি গ্রহণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, ময়মনসিংহ-৭ (ত্রিশাল) আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন এবং ময়মনসিংহের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ।
এই খালের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বাংলাদেশের এক দীর্ঘ ইতিহাস। ১৯৭৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান স্বশরীরে ত্রিশালে এসে এই খালের খনন কাজ শুরু করেছিলেন। তার জ্যেষ্ঠপুত্র বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দীর্ঘ ৪৫ বছর পর সেই স্মৃতিবিজড়িত খালের পুনঃখনন কাজের উদ্বোধন করায় স্থানীয় মানুষের মাঝে ব্যাপক আবেগ ও উচ্ছ্বাসের সৃষ্টি হয়েছে।
উদ্বোধন উপলক্ষে বৈলর ইউনিয়নের দরিয়ারপুর গ্রামের কানহর মোড়ে স্থানীয় মানুষের ঢল নামে। পাঁচ দশক আগের সেই দিনের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে কানহর গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা জালাল ইসলাম আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলেন, “আমি তখন যুবক ছিলাম। চোখে চশমা এবং সাধারণ পোশাক পরে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান আমাদের এলাকায় এসেছিলেন। তিনি নিজে কোদাল হাতে মাটি কেটে খালের কাজ উদ্বোধন করেছিলেন। কাজ শেষে স্থানীয় মাদ্রাসার সামনে অনেকক্ষণ বসে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন।”
একই সুর শোনা গেল কানহর মোড় মসজিদের সাবেক ইমাম মাওলানা মো. শহিদুল্লাহর কণ্ঠেও। তিনি বলেন, “পিতা রাষ্ট্রপতি হিসেবে এই খালের পাড়ে এসেছিলেন, আজ তার সন্তান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে এখানে এসেছেন। এটি আমাদের জন্য অত্যন্ত আনন্দের বিষয়। তবে আমাদের এই এলাকাটি দীর্ঘদিন ধরে অবহেলিত। যে রাস্তা দিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি হেঁটে গিয়েছিলেন, সেটি আজও কাঁচা রয়ে গেছে। আমরা চাই এই সড়কটি পাকা করার ঘোষণা দেওয়া হোক। পাশাপাশি আমাদের এলাকায় কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তাই এখানে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক (তৃণমূল স্বাস্থ্যকেন্দ্র) স্থাপন করা অত্যন্ত জরুরি।”
উদ্বোধন শেষে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেই কোদাল হাতে খালের মাটি কাটেন এবং খালের পাড়ে একটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। পরে তিনি সেখানে আয়োজিত একটি সংক্ষিপ্ত সুধী সমাবেশে বক্তব্য দেন। স্থানীয় সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন তার বক্তব্যে উল্লেখ করেন, ১৯৭৬-৭৭ সালে দেশব্যাপী যে খাল খনন কর্মসূচি শুরু হয়েছিল, তারই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি নিজে এসে এই বৈলর খালের পরিমাপ ও খনন কার্যক্রমের তদারকি করেছিলেন।
খাল পুনঃখননের এই কর্মসূচি শেষ করে প্রধানমন্ত্রী বিকেলে ত্রিশালের নজরুল মঞ্চে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তী উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করেন। এরপর সন্ধ্যায় ত্রিশাল নজরুল অডিটোরিয়ামে (মিলনায়তন) ময়মনসিংহ উত্তর, দক্ষিণ ও মহানগর শাখার রাজনৈতিক সভায় দলের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁর যোগ দেওয়ার কথা রয়েছে।
নদীমাতৃক বাংলাদেশে কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর রক্ষায় খাল ও জলাশয় খননের গুরুত্ব অপরিসীম। ত্রিশালের ‘ধরার খাল’ পুনঃখননের এই উদ্যোগ স্থানীয় কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত করার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখবে। তবে কেবল খনন করাই শেষ কথা নয়, গ্রামীণ অবকাঠামোর উন্নয়ন যেমন রাস্তাঘাট পাকা করা এবং স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্থানীয়দের দাবির প্রতি নজর দেওয়াও জরুরি। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন তা স্থানীয় মানুষের মৌলিক চাহিদার সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়।