রাজধানীতে সফররত তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ ও ফলপ্রসূ বৈঠক করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল। গতকাল রাতে ঢাকার একটি হোটেলে অনুষ্ঠিত এই দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে দুই দেশের পারস্পরিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, রোহিঙ্গা সংকটের কূটনৈতিক সমাধান ও বাণিজ্য সম্প্রসারণসহ নানাবিধ কৌশলগত বিষয়ে আলোচনা হয়।
গতকাল শুক্রবার রাতে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক এবং সংসদের বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ মো. নাহিদ ইসলামের নেতৃত্বে দলটির একটি প্রতিনিধিদল অংশ নেয়। আজ শনিবার (৬ জুন) বিকেলে দলের পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতির মাধ্যমে এই বৈঠকের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। বৈঠকে প্রতিনিধিদলের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন এনসিপি নেতা আখতার হোসেন, নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, আতিক মুজাহিদ, আলাউদ্দিন মোহাম্মদ, হোমায়রা নূর ও সালমান রিফাত।
বৈঠকের শুরুতেই তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ছাত্র-জনতার আন্দোলন এবং শেখ হাসিনা সরকারের পতনে সাধারণ মানুষের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেন। জুলাই বিপ্লব সফল করার ক্ষেত্রে এনসিপি নেতৃত্বের অবদানের কথা স্মরণ করে তিনি দলটির প্রতিনিধিদলকে আন্তরিক অভিনন্দন জানান। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের এই সংগ্রাম বিশ্ব দরবারে একটি ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তুরস্ক সর্বদা বাংলাদেশের এই গণতান্ত্রিক রূপান্তর ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখার প্রক্রিয়ায় পাশে থাকবে।
বৈঠকে আলোচনার একটি বড় অংশ জুড়ে ছিল রোহিঙ্গা সংকট। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে মো. নাহিদ ইসলাম মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হওয়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় দেওয়া এবং এই মানবিক সংকটের শুরু থেকেই তুরস্কের অবিচল কূটনৈতিক সমর্থনের জন্য দেশটির সরকারের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। বিশেষ করে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন ফোরামে তুরস্ক যেভাবে রোহিঙ্গাদের অধিকার ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রেখে আসছে, তার প্রশংসা করা হয়। জবাবে হাকান ফিদান আশ্বস্ত করেন যে, এই সংকটের একটি স্থায়ী ও মর্যাদাপূর্ণ রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুরস্ক তার বহুমাত্রিক কূটনৈতিক তৎপরতা ও মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখবে।
প্রতিরক্ষা সহযোগিতা (সামরিক ক্ষেত্রে কারিগরি ও প্রযুক্তিগত সহায়তা বিনিময়) সম্প্রসারণের বিষয়েও বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। প্রতিনিধিদলের পক্ষ থেকে বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা খাতের আধুনিকায়নে তুরস্কের উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়। এছাড়া দুই দেশের পারস্পরিক বাণিজ্যিক সম্পর্ককে আরও সুদৃঢ় করতে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বৃদ্ধি এবং শুল্ক সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনের বিষয়ে ফলপ্রসূ আলোচনা হয়। উভয় পক্ষই এই বিষয়ে একমত পোষণ করেন যে, বাংলাদেশ ও তুরস্কের অর্থনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি কাজে লাগাতে সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে নতুন যোগাযোগের পথ উন্মোচন করা প্রয়োজন।
বৈঠকে বাংলাদেশ ও তুরস্কের যুব সমাজের মধ্যে বৃহত্তর যোগাযোগ ও মেধার আদান-প্রদান বৃদ্ধির জন্য শক্তিশালী বিনিময় কর্মসূচি (পারস্পরিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময় কার্যক্রম) গড়ে তোলার ওপর জোর দেওয়া হয়। এনসিপি নেতারা মনে করেন, দুই দেশের তরুণদের পারস্পরিক সহযোগিতা ও অভিজ্ঞতা বিনিময় ভবিষ্যৎ দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও মজবুত ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে। তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এই প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়ে তরুণদের উন্নয়ন ও প্রশিক্ষণে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণের আশ্বাস দেন।
বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যকার এই বৈঠকটি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। একটি ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের নতুন পথচলায় তুরস্কের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক শক্তির সমর্থন দেশের বৈদেশিক নীতির জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। বিশেষ করে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রে সহযোগিতা এবং রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে তুরস্কের জোরালো কূটনৈতিক অবস্থান বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত সহায়ক হবে। পাশাপাশি, দুই দেশের যুব সমাজের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির প্রস্তাবটি ভবিষ্যতে দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই সম্পর্ক বিনির্মাণে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এই আলোচনাগুলো যাতে কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ না থেকে বাস্তব দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়, সেদিকে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে দৃষ্টি দিতে হবে।