নতুন সরকার গঠনের পর দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপির নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বার্ষিক আয়-ব্যয় পরিকল্পনা (বাজেট) অধিবেশন শুরু হয়েছে। রোববার বিকেল ৩টায় সংসদ সভাপতি (স্পিকার) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে শুরু হওয়া এই অধিবেশনকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, রোববার বিকেল ঠিক ৩টায় জাতীয় সংসদ ভবনের মূল সভাকক্ষে সংসদ সভাপতি (স্পিকার) হাফিজ উদ্দিন আহমদের সভাপতিত্বে এই গুরুত্বপূর্ণ অধিবেশন শুরু হয়। এটি বর্তমান সরকারের প্রথম বার্ষিক পরিকল্পনা অধিবেশন হওয়ায় সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের উপস্থিতি ছিল বিশেষভাবে চোখে পড়ার মতো। অধিবেশনের শুরুতেই সভাপতি নতুন সংসদ সদস্যদের স্বাগত জানান এবং সংসদীয় রীতি অনুযায়ী অধিবেশনের প্রধান প্রধান কার্যসূচি ঘোষণা করেন। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় সংসদের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি দেশের সার্বিক কল্যাণে ও অর্থনৈতিক উন্নয়নে সকলকে একযোগে গঠনমূলক ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।
দেশবাসীর মূল আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে আগামী ১১ জুন। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ওই দিন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য সরকারের প্রথম প্রস্তাবিত জাতীয় বার্ষিক আয়-ব্যয় পরিকল্পনা (বাজেট) সংসদে উপস্থাপন করবেন। দেশের বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ এবং সাধারণ মানুষের ধারণা, নতুন এই আর্থিক পরিকল্পনাটি প্রণয়ন করা সরকারের জন্য বেশ চ্যালেঞ্জিং হবে। বাজারমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং সার্বিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখার মতো জটিল বিষয়গুলোর সমাধান খুঁজে বের করতে হবে এই পরিকল্পনার মাধ্যমে। অর্থমন্ত্রী এর আগে বিভিন্ন সময়ে ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, তাদের মূল লক্ষ্য থাকবে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান সহজ করা এবং দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর আমূল সংস্কার করা।
এই বিশেষ অধিবেশনটি ডাকার ক্ষেত্রে দেশের সর্বোচ্চ আইনের সুনির্দিষ্ট ধারা অনুসরণ করা হয়েছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৭২ অনুচ্ছেদের (১) দফায় রাষ্ট্রপতিকে যে একক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে, সেই ক্ষমতা বলেই রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ৭ মে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অধিবেশনটি আহ্বান করেছিলেন। দেশের সংসদীয় গণতন্ত্রে রাষ্ট্রপতির এই আদেশ জারির প্রক্রিয়াটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, যা সরকারের আইন প্রণয়ন ও অর্থ পাসের প্রক্রিয়াকে সাংবিধানিক বৈধতা দান করে। এর ফলে সরকার নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই নতুন অর্থবছরের অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের অনুমোদন করিয়ে নিতে সক্ষম হবে।
এর আগে শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনটির সফল সমাপ্তি ঘটেছিল গত ৩০ এপ্রিল। সে সময় মোট ২৫টি কার্যদিবসে নিবিড়ভাবে কাজ করেছিলেন দেশের আইনপ্রণেতারা। ওই অধিবেশনে সংসদীয় ইতিহাসের অন্যতম বড় কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন হয়, যেখানে দেশের বিভিন্ন খাতের সংস্কার সংক্রান্ত মোট ৯৪টি খসড়া আইন (বিল) পাস করা হয়েছিল। জনপ্রশাসন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং জননিরাপত্তার জন্য আনা এসব খসড়া আইন বর্তমান সংসদের প্রথম অধিবেশনের কার্যকারিতাকে প্রমাণ করে।
সংসদীয় নিয়ম অনুযায়ী, অর্থমন্ত্রী কর্তৃক বাজেট পেশ করার পর এর ওপর সাধারণ ও বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে। সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যরা দীর্ঘ কয়েক সপ্তাহ ধরে এই প্রস্তাবিত আয়-ব্যয় পরিকল্পনার ওপর তাদের মতামত, সংশোধনী ও চুলচেরা বিশ্লেষণ তুলে ধরবেন। এরপর জুন মাসের শেষভাগে আইনপ্রণেতাদের সম্মতিক্রমে নতুন অর্থ বছরের এই মহাপরিকল্পনাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদিত হবে।
একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সাধারণ মানুষের ভাগ্য নির্ধারণে বার্ষিক বাজেট অধিবেশন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নতুন সরকারের প্রথম বাজেট হিসেবে দেশের আপামর জনসাধারণের প্রত্যাশা এবার অনেক বেশি। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং অভ্যন্তরীণ বাজারের নানাবিধ সংকট মোকাবিলা করে অর্থমন্ত্রী কতটা বাস্তবমুখী ও জনবান্ধব পরিকল্পনা সংসদে পেশ করতে পারেন, সেটিই এখন দেখার বিষয়। সংসদ সদস্যরা দলমতের ঊর্ধ্বে উঠে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী আর্থিক দলিল পাস করবেন—দেশবাসীর এটাই মূল প্রত্যাশা।