উত্তরাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান উৎস তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে বহুমুখী ও টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে একটি বড় মহাপরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এই পরিকল্পনার আওতায় ১১০ কিলোমিটার নদীশাসন, ১১০ কিলোমিটার নদী খনন (ড্রেজিং), ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ নির্মাণ, ৬৭টি গ্রোয়েন ও স্পার (নদীর প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের বিশেষ কাঠামো) নির্মাণ-মেরামত এবং প্রায় ১৭০ বর্গকিলোমিটার ভূমি পুনরুদ্ধারের কথা বলা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে রংপুর-১ আসনের সংসদ সদস্য মো. রায়হান সিরাজীর এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে পানিসম্পদমন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি এ তথ্য জানান। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম।
সংসদে পানিসম্পদমন্ত্রী বলেন, তিস্তা নদী বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষি ও অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে নদীর উজানে বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণসহ নানা সীমাবদ্ধতার কারণে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানিপ্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমে যায়। ফলে নদী অববাহিকার তিস্তা সেচ প্রকল্পসহ সামগ্রিক কৃষি কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অন্যদিকে, বর্ষা মৌসুমে উজানে অতিবৃষ্টির ফলে হঠাৎ পানি বৃদ্ধি পেয়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় আকস্মিক বন্যা ও তীব্র নদীভাঙন দেখা দেয়। এই দ্বিমুখী সংকট দূর করতেই সরকার তিস্তাকে নিয়ে একটি স্থায়ী সমাধান খুঁজছে।
মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি জানান, তিস্তা নদী অববাহিকার পাঁচটি জেলা—রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা ও লালমনিরহাটে নদীভাঙন রোধে সরকার সবসময় তৎপর রয়েছে। এরই অংশ হিসেবে ২০২৪–২৫ এবং ২০২৫–২৬ অর্থবছরে ২২২ কোটি ২৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪২ দশমিক ১৭ কিলোমিটার নদীতীর সংরক্ষণ কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে।
মন্ত্রী সংসদে আরও জানান, তিস্তা নদীকে কেন্দ্র করে একটি টেকসই ও সমন্বিত উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে ইতিমধ্যে একটি বিশদ সমীক্ষা শেষ হয়েছে। এই সমীক্ষা প্রতিবেদনে তিস্তা মহাপরিকল্পনার প্রধান প্রস্তাবনাগুলো তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ১১০ কিলোমিটার নদীশাসন ও ১১০ কিলোমিটার নদী খননের পাশাপাশি ২২৪ কিলোমিটার বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ওপর আধুনিক সড়ক নির্মাণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়াও নদীভাঙন রোধে ৬৭টি নতুন গ্রোয়েন ও স্পার নির্মাণ ও সংস্কার এবং ১৭০ বর্গকিলোমিটার নতুন ভূমি পুনরুদ্ধার ও উন্নয়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে এই সমীক্ষা প্রতিবেদনের কারিগরি ও আর্থিক বিষয়গুলো বিভিন্ন সরকারি ও নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে নিবিড়ভাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। পানিসম্পদমন্ত্রী আশা প্রকাশ করে বলেন, প্রস্তাবিত এই বৃহৎ প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে শুষ্ক মৌসুমে পানি সংরক্ষণ ও আধুনিক সেচসুবিধা বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে। এর ফলে উত্তরবঙ্গের প্রধান চালিকাশক্তি কৃষিখাতে ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং ফসলের বহুমুখীকরণ সম্ভব হবে। একই সাথে নদীর তীরবর্তী এলাকায় নতুন রাস্তা, সেতু ও মজবুত বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে গ্রামীণ অবকাঠামোর অভূতপূর্ব উন্নতি ঘটবে।
দীর্ঘদিন ধরে তিস্তার ভাঙন ও বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত নদীপাড়ের সাধারণ মানুষ এই প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি বাস্তবায়িত হলে তিস্তা অববাহিকায় প্রতি বছর কোটি কোটি টাকার ফসলের ক্ষয়ক্ষতি রোধ করা যাবে। এটি স্থানীয়ভাবে বিপুল কর্মসংস্থান সৃষ্টি করবে, দারিদ্র্য হ্রাস করবে এবং নৌযোগাযোগের পথ সুগম করে আঞ্চলিক ও জাতীয় বাণিজ্যের নতুন দুয়ার উন্মোচন করবে বলে সমীক্ষায় উল্লেখ করা হয়েছে।