রাজধানী ঢাকার লাগামহীন দখল ও মাত্রাতিরিক্ত পরিবেশ দূষণে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। ঢাকা এখন আর বসবাসের উপযোগী নেই উল্লেখ করে তিনি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর সুফল সাধারণ মানুষের কাছে কতটুকু পৌঁছাচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়নের দাবি জানিয়েছেন।
শনিবার রাজধানীর একটি বিশেষ মিলনায়তনে ঢাকা দক্ষিণ নগর কর্তৃপক্ষের নাগরিক সেবা বিষয়ক নতুন একটি সমন্বিত উদ্যোগ ‘দক্ষিণের জানালা’-এর শুভ উদ্বোধনকালে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী এসব কথা বলেন। প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে বুড়িগঙ্গার বর্তমান করুণ দশার ওপর তীব্র ক্ষোভ ও দুঃখ প্রকাশ করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তাঁর বক্তব্যে আক্ষেপ করে বলেন, ঢাকা মহানগরী আমাদের বসবাসের প্রধান জায়গা হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে এখানে টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়েছে। মাঝে মাঝে তাঁর নিজেরই ঢাকা ছেড়ে নিজের দেশের শান্ত গ্রামীণ পরিবেশে ফিরে গিয়ে স্থায়ীভাবে থাকার তীব্র ইচ্ছা জাগে। ঘর থেকে বাইরে বের হলেই একটু বিশুদ্ধ প্রাণবায়ু (নিঃশ্বাস নেওয়ার বাতাস) পাওয়ার সুযোগ নেই, চারদিকের বাতাস মারাত্মকভাবে দূষিত হয়ে পড়েছে।
নিজের ছাত্রজীবনের স্মৃতিচারণ করে মন্ত্রী বলেন, তিনি যখন ঢাকা মহাবিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতেন, তখন প্রায়ই সহপাঠীদের নিয়ে বুড়িগঙ্গা নদীতে নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়াতেন। অথচ এখন সেই বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে যাওয়ার মতো কোনো পরিবেশ অবশিষ্ট নেই। নদীটির পানি ও চারপাশের বাতাস এত বেশি দূষিত যে সেখানে দম নেওয়া দায়। বুড়িগঙ্গার অসহনীয় দুর্গন্ধের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তাঁর মনে হয় ঢাকা শহরের নাগরিকদের যত রকম রোগব্যাধি হচ্ছে, তার সিংহভাগের মূলে রয়েছে বুড়িগঙ্গা নদীর এই দূষিত পানি।
মন্ত্রী সতর্ক করে দিয়ে বলেন, শুধু বুড়িগঙ্গাই নয়, ঢাকার চারপাশের তুরাগ ও শীতলক্ষ্যা নদীর অবস্থাও এখন একই রকম সংকটের মুখে পড়েছে। এমতাবস্থায় ঢাকার সাধারণ নাগরিকরা শেষ পর্যন্ত যাবে কোথায়? এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য ঢাকা দক্ষিণ নগর কর্তৃপক্ষের নতুন উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, এই প্রচেষ্টার পাশাপাশি শহরের অবকাঠামোগত পরিবর্তনগুলোকে অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এবং সঠিক পরিকল্পনার মাধ্যমে বাস্তবায়ন করতে হবে।
নতুন নাগরিক সেবা মঞ্চটির প্রশংসা করে স্থানীয় সরকার মন্ত্রী বলেন, এটি কেবল একটি সাধারণ উদ্যোগ নয়, বরং এটি একটি বাসযোগ্য নগরী গড়ে তোলার আন্দোলন। এই আন্দোলন নিশ্চিতভাবেই নগরবাসীকে আলোড়িত করবে। তবে একই সাথে তিনি নীতিনির্ধারকদের দায়িত্ব নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। মন্ত্রী বলেন, শুধু সাধারণ নাগরিকদের সচেতন করলেই কি শহরের সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে? যারা ঢাকার শাসনভার পরিচালনা করছেন, কর্মপরিকল্পনা সাজাচ্ছেন এবং হাজার হাজার কোটি টাকার একের পর এক বড় বড় উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করছেন, তাদের কাজের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। এসব বিশাল উন্নয়ন প্রকল্প থেকে সাধারণ মানুষ ও নাগরিকরা আসলে কতটুকু সুফল পাচ্ছে, তা নিবিড়ভাবে মূল্যায়ন করা এখন সময়ের দাবি।
ঢাকা দক্ষিণ নগর কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ‘দক্ষিণের জানালা’ মূলত ঢাকার নাগরিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা, গবেষকদের পরিবেশিত জ্ঞান এবং নগর প্রশাসনের সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার এক চমৎকার সমন্বয়। এই বিশেষ উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ নাগরিকরা সরাসরি তাদের সমস্যা ও সম্ভাবনার কথা বলতে পারবেন এবং বিশেষজ্ঞরা বিভিন্ন খাতের তথ্যভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভবিষ্যৎ ঢাকা দক্ষিণের টেকসই উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন করবেন। এই নতুন উদ্যোগে আগামীতে খাতভিত্তিক আলোচনাসভা, নাগরিকদের সাথে সরাসরি মতবিনিময় সভা, প্রযুক্তিভিত্তিক প্রচারণা এবং একটি সমন্বিত উন্নয়ন মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হবে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ বক্তা হিসেবে ঢাকা দক্ষিণ নগর কর্তৃপক্ষের প্রশাসক আবদুস সালাম বলেন, এই নতুন সেবা কার্যক্রমের মাধ্যমে নাগরিক সেবার এক নতুন দ্বার উন্মোচিত হলো। তিনি মনে করিয়ে দেন যে, যেকোনো নগর উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো রাজনৈতিক নেতৃত্ব, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং জনগণের সম্মিলিত অংশীদারিত্ব।
ঢাকা দক্ষিণকে দেশের ঐতিহ্য, সংস্কৃতি এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের মূল কেন্দ্র হিসেবে বর্ণনা করে তিনি আরও বলেন, এই শহরের বুক যেমন অমিত সম্ভাবনায় ভরা, ঠিক তেমনি এর সংকটগুলোও অনেক বড় চ্যালেঞ্জ। তীব্র যানজট, বর্ষার জলাবদ্ধতা, মারাত্মক বায়ুদূষণ, ত্রুটিপূর্ণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং সামগ্রিক জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তব চিত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে সমস্যার চেয়ে বড় বিষয় হলো তা সমাধানের দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি। ‘দক্ষিণের জানালা’ সেই ইচ্ছাশক্তি ও সমন্বিত উদ্যোগেরই বাস্তব রূপ।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট পানিসম্পদ বিশেষজ্ঞ ড. আইনুন নিশাত এবং ঢাকা দক্ষিণ নগর কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. জহিরুল ইসলাম। পুরো অনুষ্ঠানটির সঞ্চালনা করেন দেশের সুপরিচিত গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব আব্দুন নূর তুষার।
স্থানীয় সরকার মন্ত্রীর এই আক্ষেপ মূলত কোটি ঢাকা প্রবাসীর মনের কথাই প্রতিধ্বনিত করেছে। একটি রাজধানী যখন তার নাগরিকদের ন্যূনতম বাসযোগ্যতার নিশ্চয়তা দিতে ব্যর্থ হয়, তখন তার বাহ্যিক উন্নয়ন অর্থহীন হয়ে পড়ে। হাজার কোটি টাকার দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো তখনই সফল হবে যখন নাগরিকরা একটু নিশ্বাস নেওয়ার মতো দূষণমুক্ত বাতাস এবং বিশুদ্ধ পানি পাবেন। ‘দক্ষিণের জানালা’র মতো উদ্যোগগুলোর মাধ্যমে যদি সাধারণ মানুষের কণ্ঠস্বর নীতিনির্ধারকদের কান পর্যন্ত পৌঁছায় এবং সেই অনুযায়ী জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা যায়, তবেই কেবল ঢাকাকে পুনরায় প্রাণবন্ত ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব হবে।