রাজবাড়ীর ব্যস্ততম দৌলতদিয়া ঘাটে পারাপারকারী নৌযানে (ফেরি) ওঠার সময় চালক নিয়ন্ত্রণ হারালে প্রমত্তা পদ্মা নদীতে ছিটকে পড়ে একটি বড় যাত্রীবাহী বাস। তবে নৌযানে ওঠার আগেই স্থানীয় প্রশাসনের কঠোর নিয়মের কারণে সব যাত্রীকে নামিয়ে দেওয়ায় এক অভাবনীয় প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন বাসের অসংখ্য যাত্রী। পরবর্তীতে দীর্ঘ আড়াই ঘণ্টার শ্বাসরুদ্ধকর অভিযান শেষে উদ্ধারকারী জাহাজের মাধ্যমে নদীর তলদেশ থেকে দুর্ঘটনাকবলিত খালি বাসটি টেনে তোলা হয়।
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ২১টি জেলার মানুষের রাজধানী ঢাকায় যাতায়াতের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার হলো রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ঘাট। শুক্রবার ছুটির দিন হওয়ায় সকাল থেকেই এই ঘাটে ঘরমুখো ও কর্মস্থলগামী মানুষের বেশ ভিড় ছিল। ঘড়ির কাঁটায় সময় তখন সকাল আনুমানিক সাড়ে নয়টা। কুষ্টিয়া জেলা থেকে ছেড়ে আসা ঢাকার গাবতলীগামী ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ পরিবহনের একটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস দৌলতদিয়া ঘাটের ৭ নম্বর ভাসমান জেটি (পন্টুন) দিয়ে নদী পারাপারের অপেক্ষায় ছিল।
সারিবদ্ধ যানজট পেরিয়ে বাসটি যখন ঘাটে নোঙর করে রাখা ‘কবরী’ নামক একটি বড় পারাপারকারী নৌযানে (ফেরি) ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় এক ভয়ংকর বিপত্তি। নৌযানের নির্দিষ্ট প্রবেশপথ (কনভেনশন পকেট) দিয়ে ভেতরে ঢোকার সময় হঠাৎ করেই বাসের চালক গাড়ির স্টিয়ারিংয়ের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। বিশাল আকৃতির বাসটি নৌযানের ভেতরে সঠিকভাবে না ঢুকে এর বিপরীত পাশের ওঠানামার ভারী লোহার পাটাতন (র্যাম) সজোরে ভেঙে সোজা গিয়ে আছড়ে পড়ে পদ্মা নদীর উত্তাল পানিতে। চোখের পলকেই একটি আস্ত বাস নদীর পানিতে তলিয়ে যাওয়ার দৃশ্য দেখে ঘাটে উপস্থিত সাধারণ মানুষ, হকার এবং অন্যান্য গাড়ির চালকরা আতঙ্কে চিৎকার করে ওঠেন।
তবে এত বড় একটি দুর্ঘটনার পরও চারপাশের মানুষের উৎকণ্ঠা খুব দ্রুতই স্বস্তির নিশ্বাসে পরিণত হয়। কারণ, দুর্ঘটনা ঘটার আগেই স্থানীয় প্রশাসনের দেওয়া কঠোর নিরাপত্তা নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী, যেকোনো যাত্রীবাহী বাস নৌযানে ওঠার ঠিক আগে যাত্রীদের নিরাপত্তার স্বার্থে সবাইকে গাড়ি থেকে নিচে নামিয়ে দেওয়া বাধ্যতামূলক। এই নিয়ম মেনে বাসটি ঘাটে পৌঁছানোর পরপরই সব যাত্রীকে নিরাপদে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যাত্রীরা পায়ে হেঁটে নৌযানে ওঠার অপেক্ষায় ছিলেন। যদি যাত্রীরা বাসের ভেতরে থাকতেন, তবে পদ্মা নদীর প্রবল স্রোত ও গভীরতায় দেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে আজ এক ভয়াবহ শোকের দিন হিসেবে লিপিবদ্ধ হতো। চোখের সামনে নিজেদের বহনকারী বাসটিকে তলিয়ে যেতে দেখে যাত্রীরা সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া আদায় করেন।
বাসটিতে কোনো সাধারণ যাত্রী না থাকলেও চালক এবং তার একজন সহকারী ভেতরে অবস্থান করছিলেন। বাসটি পানিতে পড়ে যাওয়ার পরপরই স্থানীয় সাহসী জনতা এবং ঘাটে কর্মরত শ্রমিকরা দ্রুত পানিতে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তারা অত্যন্ত তৎপরতার সঙ্গে বাসের চালক ও তার সহকারীকে আহত অবস্থায় উদ্ধার করে তীরে নিয়ে আসেন। সঙ্গে সঙ্গে তাদের প্রাথমিক চিকিৎসার জন্য স্থানীয় হাসপাতালে পাঠানো হয়। বর্তমানে তারা চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং শঙ্কামুক্ত বলে জানা গেছে।
দুর্ঘটনার খবর পেয়ে কালবিলম্ব না করে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) উদ্ধারকারী দল এবং নৌপুলিশ ঘটনাস্থলে ছুটে আসে। নদীর তলদেশে তলিয়ে যাওয়া বাসের অবস্থান শনাক্ত করতে দ্রুত ডুবুরি দলকে পানিতে নামানো হয়। ডুবুরিরা নিশ্চিত করেন যে বাসের ভেতরে আর কোনো মানুষ আটকে নেই। এরপর শুরু হয় মূল উদ্ধারকাজ।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাট শাখার সহকারী মহাব্যবস্থাপক মো. সালাহ উদ্দিন গণমাধ্যমকে দুর্ঘটনার সার্বিক চিত্র সম্পর্কে অবহিত করেন। তিনি জানান, দুর্ঘটনা ঘটার পরপরই উদ্ধারকারী বিশেষ জাহাজ ‘হামজা’-কে তলব করা হয়। বেলা ১২টার দিকে অর্থাৎ দুর্ঘটনার প্রায় আড়াই ঘণ্টা পর উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ তার শক্তিশালী ক্রেনের সাহায্যে নদীর তলদেশ থেকে সম্পূর্ণ দুমড়েমুচড়ে যাওয়া খালি বাসটিকে সফলভাবে উদ্ধার করে তীরে তুলে আনতে সক্ষম হয়।
এই দুর্ঘটনাটি ঘাটে অপেক্ষমাণ হাজারো মানুষকে জীবনের এক চরম অনিশ্চয়তার কথা পুনরায় মনে করিয়ে দিয়েছে। একই সঙ্গে নিয়ম মেনে চলার সুফল যে কতটা ব্যাপক হতে পারে, তার এক জীবন্ত প্রমাণ হয়ে থাকল রোমহর্ষক এই ঘটনাটি।
দৌলতদিয়া ঘাটের এই দুর্ঘটনা আমাদের জন্য একই সঙ্গে সতর্কবার্তা এবং নিয়ম মানার এক চমৎকার উদাহরণ। প্রশাসনের একটি ছোট কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নিয়ম—‘নৌযানে ওঠার আগে যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া’ আজ অসংখ্য মায়ের কোল খালি হওয়ার হাত থেকে বাঁচিয়েছে। এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, আইন ও নিয়মনীতি কেবল কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না রেখে যদি কঠোরভাবে মাঠপর্যায়ে প্রয়োগ করা হয়, তবে বড় ধরনের দুর্যোগ এড়ানো সম্ভব। তবে যাত্রীরা বেঁচে গেলেও প্রশ্ন থেকে যায় যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি ও চালকদের দক্ষতা নিয়ে। একটি বাস কেন হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারাবে, তা খতিয়ে দেখা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। দেশের প্রতিটি ফেরিঘাটে এই যাত্রী নামানোর নিয়মটি যেন শতভাগ নিশ্চিত করা হয় এবং ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন যেন মহাসড়কে চলতে না পারে, সে বিষয়ে পরিবহন মালিক ও প্রশাসনকে আরও বেশি দায়বদ্ধ হতে হবে।