রাজবাড়ীর দৌলতদিয়া ঘাটে পারাপারের জন্য নৌযানে (ফেরি) ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যাত্রীবাহী একটি বাস হুড়মুড় করে পদ্মা নদীতে পড়ে যাওয়ার এক চাঞ্চল্যকর ঘটনা ঘটেছে। তবে নিয়ম মেনে পারাপারের আগেই সব যাত্রী গাড়ি থেকে নেমে যাওয়ায় এক বিশাল এবং মর্মান্তিক প্রাণহানির হাত থেকে রক্ষা পেয়েছেন বাসে থাকা প্রায় চল্লিশ জন মানুষ। শুক্রবার সকালের এই ভয়াবহ দৃশ্য দেখে শিউরে ওঠেন ঘাটে উপস্থিত সাধারণ মানুষ ও ঘাট সংশ্লিষ্টরা।
শুক্রবার, ৫ জুন। সকাল তখন আনুমানিক সাড়ে নয়টা। রাজবাড়ী জেলার গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ঘাট এলাকায় প্রতিদিনের মতোই পারাপারের অপেক্ষায় ছিল অসংখ্য ছোট-বড় যানবাহন। মেহেরপুর জেলার গাংনী উপজেলা থেকে ছেড়ে আসা ‘এসবি সুপার ডিলাক্স’ নামের একটি দূরপাল্লার যাত্রীবাহী বাস ঢাকার গাবতলীর উদ্দেশে যাত্রা করছিল। বাসটি ৭ নম্বর ঘাটের সংযোগ সেতু দিয়ে যখন পারাপারকারী নৌযানে ওঠার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘটে যায় অনাকাঙ্ক্ষিত এই বিপত্তি। ঢালু অংশ দিয়ে ওঠার সময় হঠাৎ করেই চালক তার গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন। চোখের পলকেই বিশাল আকৃতির বাসটি ছিটকে গিয়ে সোজা আছড়ে পড়ে প্রমত্তা পদ্মা নদীর বুকে।
শুক্রবার ছুটির দিন থাকায় ঘাটে যাত্রীদের ভিড় অন্যদিনের তুলনায় কিছুটা বেশিই ছিল। যারা নিজেদের চোখের সামনে আস্ত একটি বাসকে নদীর অতল গর্ভে হারিয়ে যেতে দেখেছেন, তারা এক মুহূর্তের জন্য আতঙ্কে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। সবার মনেই তখন একটাই ভয়—বাসের ভেতরে থাকা যাত্রীদের কী হলো! ঘাটের চারদিকে মুহূর্তের মধ্যেই এক ভীতিকর পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই চারপাশের এই উৎকণ্ঠা স্বস্তিতে রূপ নেয়। ঘাট কর্তৃপক্ষ নিশ্চিত করে যে, পারাপারের কঠোর নিয়ম অনুযায়ী নৌযানে ওঠার ঠিক আগে আগেই বাসের ভেতরে থাকা প্রায় চল্লিশ জন যাত্রীকে নিরাপদে নিচে নামিয়ে দেওয়া হয়েছিল। যাত্রীরা সবাই তখন পায়ে হেঁটে পারাপারের অপেক্ষায় ছিলেন। যদি এই নিয়মটি যথাযথভাবে মানা না হতো, তবে দেশের নৌ-দুর্ঘটনার ইতিহাসে আজ হয়তো আরও একটি অত্যন্ত শোকাবহ দিন হিসেবে লেখা থাকত।
এই আকস্মিক দুর্ঘটনায় বাসের মূল চালক এবং তার সহযোগী গুরুতরভাবে আঘাত পেয়েছেন। ঘটনার পরপরই স্থানীয় মানুষজন এবং ঘাটে কর্মরত শ্রমিকরা দ্রুত তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন সংস্থার (বিআইডব্লিউটিসি) দৌলতদিয়া ঘাটের সহকারী মহাব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সালাহউদ্দিন গণমাধ্যমের কাছে এই দুর্ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, যাত্রীরা বাসের বাইরে অবস্থান করায় সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমতে বড় ধরনের কোনো প্রাণহানি বা নিখোঁজ হওয়ার মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেনি।
দুর্ঘটনা ঘটার সাথে সাথেই ঘাট কর্তৃপক্ষ, নৌপুলিশ এবং দমকল বাহিনীর (ফায়ার সার্ভিস) সদস্যরা অত্যন্ত দ্রুততার সাথে ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন এবং উদ্ধারকাজ শুরু করেন। নদীগর্ভে তলিয়ে যাওয়া বাসটির অবস্থান অল্প সময়ের মধ্যেই শনাক্ত করা সম্ভব হয়। এরপর বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বিশেষ উদ্ধারকারী জাহাজ ‘হামজা’ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাসটিকে নদী থেকে টেনে তোলার কাজ শুরু করে। পদ্মার স্রোত এবং গভীরতার কারণে শুরুতে কিছুটা বেগ পেতে হলেও উদ্ধারকর্মীরা হাল ছাড়েননি।
পাশাপাশি দমকল বাহিনী ও নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের অভিজ্ঞ ডুবুরি দল পানির নিচে তলিয়ে থাকা বাসের ভেতরে প্রবেশ করে তন্নতন্ন করে তল্লাশি চালান। মূলত বাসের ভেতরে কোনো কর্মী, শিশু বা বয়স্ক যাত্রী ভুলবশত আটকে পড়ে আছেন কি না, তা শতভাগ নিশ্চিত হতেই এই শ্বাসরুদ্ধকর তল্লাশি অভিযান চালানো হয়।
দৌলতদিয়া ঘাট বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর মানুষের রাজধানীতে যাতায়াতের অন্যতম প্রধান প্রবেশদ্বার। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ও শত শত যানবাহন এই ঘাট দিয়ে পারাপার হয়। তাই এই ঘাটের সার্বিক নিরাপত্তা সব সময়ই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। এদিনের ঘটনাটি ফেরিঘাটের নিয়মকানুন মেনে চলার গুরুত্বকে নতুন করে সবার সামনে তুলে ধরেছে।
এই দুর্ঘটনাটি আমাদের দেশের নৌপথ ও ঘাটগুলোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং নিয়ম মানার সংস্কৃতি নিয়ে নতুন করে ভাবার সুযোগ তৈরি করেছে। যাত্রীদের আগে নামিয়ে দেওয়ার যে নিয়মটি আজ ৪০টি তাজা প্রাণ বাঁচালো, তা সব সময় সব ঘাটে ও সব যানবাহনের ক্ষেত্রে কঠোরভাবে পালন করা হয় কি না, সেটি কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন। একইসঙ্গে নৌযানে ওঠার সময় চালকরা কেন নিয়ন্ত্রণ হারান—এটি কি যানবাহনের যান্ত্রিক ত্রুটি, চালকের অদক্ষতা নাকি ঘাটের কাঠামোগত দুর্বলতা, তা গভীরভাবে তদন্ত করা উচিত। একটি দুর্ঘটনা কেবল সফল উদ্ধারকাজেই শেষ হওয়া উচিত নয়, বরং এর পেছনের মূল কারণগুলো খুঁজে বের করে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করলেই ভবিষ্যতে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত বিপদ চিরতরে এড়ানো সম্ভব হবে।