বাংলাদেশে বর্তমানে ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত বলে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মাদকের এই ভয়াবহ আগ্রাসন রুখতে এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নয়নে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে। এর অংশ হিসেবে মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্মকর্তাদের অস্ত্র দেওয়ার পাশাপাশি ঝুলে থাকা মাদক মামলাগুলোর দ্রুত নিষ্পত্তির লক্ষ্যে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল (বিশেষ আদালত) গঠনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান।
বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে আন্তর্জাতিক মাদকবিরোধী দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। অনুষ্ঠান শেষে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১৫টি বেসরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিনিধিদের হাতে অনুদানের আর্থিক চেক তুলে দেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ দেশের সামগ্রিক মাদক পরিস্থিতির ওপর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, দেশে এখন প্রায় ৮২ লাখ মানুষ মাদকাসক্তের অভিশাপ নিয়ে বেঁচে আছেন। বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে সিনথেটিক (কৃত্রিম উপায়ে গবেষণাগারে তৈরি) এবং সেমি-সিনথেটিক (আংশিক রাসায়নিক উপায়ে তৈরি) মাদকের ব্যাপক বিস্তারের কারণে বিপুল সংখ্যক তরুণ ও কর্মক্ষম মানুষ এই অন্ধকার জগতে পা বাড়িয়েছে। যা দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামোর জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যমান মাদক আইনের সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, "আমাদের প্রচলিত আইন দিয়ে মাদকের এই আধুনিক ও বহুমাত্রিক চোরাচালান প্রতিরোধ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সাথে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের দক্ষতা বাড়ানো ও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। কারণ মাদক চোরাকারবারি সিন্ডিকেটগুলো অত্যন্ত অত্যাধুনিক ও ভারী আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করছে, অথচ আমাদের মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের কাছে আত্মরক্ষার জন্য কোনো অস্ত্র নেই।"
তিনি বিষয়টিকে বাংলা প্রবাদের সঙ্গে তুলনা করে বলেন, কর্মকর্তারা অনেকটা 'ঢাল নেই তলোয়ার নেই নিধিরাম সর্দার'-এর মতো অবস্থায় কাজ করছেন। এই সংকট কাটাতে মাদক নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের কাজ চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং চলতি সংসদ অধিবেশনেই এটি বিল আকারে উত্থাপিত হতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
মামলা জটের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, সারাদেশে মাদক সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ মামলা বছরের পর বছর ধরে আদালতে অমীমাংসিত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। শুধুমাত্র রাজধানী ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার মাদকের মামলা ঝুলে আছে। দেশের অন্যান্য জেলাগুলোতেও এই চিত্র অত্যন্ত নাজুক।
তিনি মন্তব্য করেন, প্রচলিত আদালত ব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ থাকার কারণে এই বিশাল মামলা জট দূর করা খুবই কঠিন। এই সমস্যার স্থায়ী ও দ্রুত সমাধানের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের লিখিত প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এই ট্রাইব্যুনাল গঠিত হলে মাদক মামলার গতি যেমন বাড়বে, তেমনি অপরাধীদের দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি সাধারণ আদালতেও মাদক মামলার স্বাভাবিক বিচারিক প্রক্রিয়া চলমান থাকবে।
মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনার প্রতি জোর দিয়ে মন্ত্রী বলেন, ১৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট অত্যাধুনিক সরকারি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। এছাড়া বেসরকারি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে ৭৩টি পুনর্বাসন কেন্দ্রকে সরকারের পক্ষ থেকে মোট এক কোটি ১০ লাখ টাকা অনুদান দেওয়া হয়েছে। মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সরকারি প্রচেষ্টার পাশাপাশি তিনি পরিবার ও সমাজকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।