Logo
ট্রেন্ডিং: হামে আরও ৫ শিশুর মৃত্যু, নতুন আক্রান্ত সহস্রাধিক যুবলীগ চেয়ারম্যান পরশ ও স্ত্রীর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা বাংলাদেশ আর কখনও কারও কাছে মাথা নত করবে না: সংসদে খলিলুর নেপাল সীমান্তে প্রলয়ঙ্করী বন্যা: নিহত ৩৩০, নিখোঁজ সহস্রাধিক

ধানের মণ ৮০০, শ্রমিকের মজুরি ১২০০: জামালপুরে লোকসানের মুখে বোরো চাষিরা

Roksana
29 August 2026, 02:12 AM পড়তে ১ মিনিট
ধানের মণ ৮০০, শ্রমিকের মজুরি ১২০০: জামালপুরে লোকসানের মুখে বোরো চাষিরা

মাঠের পর মাঠ সোনালি বোরো ধান বাতাসে দুললেও চাষির মনে কোনো আনন্দ নেই। জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলায় এক মণ ধানের বিক্রয়মূল্যের চেয়ে একজন কৃষি শ্রমিকের দৈনিক মজুরি অনেক বেশি হওয়ায় হাজার হাজার টাকা লোকসান গুনছেন কৃষকরা। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেয়ে চরম হতাশা আর অনিশ্চয়তায় দিন পার করছেন তারা।

‘ধানের মণ ৮০০ টাকা, আর একজন কামলার (কৃষি শ্রমিক বা দিনমজুর) মজুরি ১২০০ টাকা। তাহলে আমরা খামু কি, বেচমুই বা কি?’— কথাগুলো বলার সময় জামালপুর জেলার মেলান্দহ উপজেলার মাহমুদপুর গ্রামের কৃষক নজরুল ইসলামের চোখেমুখে স্পষ্ট হয়ে ওঠে গভীর হতাশার ছাপ। রোদে পোড়া চামড়া আর ঘামে ভেজা শরীরে তিনি যেন পুরো দেশের প্রান্তিক কৃষকদের না বলা কষ্টের প্রতিনিধিত্ব করছিলেন।

মঙ্গলবার (১২ মে) দুপুরে ধান কাটার ভরা মৌসুমে মেলান্দহ উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র। কৃষকের আঙিনায় এখন উৎসবের আমেজ থাকার কথা থাকলেও, সেখানে বিরাজ করছে এক চাপা হাহাকার। সোনালি ধানে ভরে থাকা বিস্তীর্ণ ক্ষেতের পাশে দাঁড়িয়ে কৃষকরা এখন কেবলই তাদের লোকসানের হিসাব মেলাচ্ছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, গত কয়েক বছরে কৃষি উপকরণের দাম বেড়েছে কয়েকগুণ। সার, বীজ, জ্বালানি তেল ও সেচযন্ত্রের খরচ মেটাতে গিয়ে এমনিতেই কৃষকের নাভিশ্বাস ওঠার উপক্রম। তার ওপর চলতি মৌসুমে তীব্র শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটার মজুরি এখন আক্ষরিক অর্থেই আকাশছোঁয়া। বাজারে যখন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফলানো এক মণ বোরো ধানের দাম মাত্র ৮০০ টাকা, তখন একজন কৃষি শ্রমিককে দৈনিক মজুরি দিতে হচ্ছে এক হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত।

স্থানীয় কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে লোকসানের এক ভয়াবহ চিত্র পাওয়া যায়। প্রতি বিঘা জমির ধান কেটে ঘরে তুলতে প্রায় আটজন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। দৈনিক ১২০০ টাকা মজুরি ধরলে শুধুমাত্র ধান কাটার জন্যই শ্রমিক বাবদ খরচ দাঁড়িয়ে যায় প্রায় নয় হাজার ৬০০ টাকা। এর সঙ্গে জমি প্রস্তুত করা, চারা কেনা বা বীজতলা তৈরি, সার প্রয়োগ, সেচ দেওয়া এবং অন্যান্য পরিচর্যা মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান উৎপাদনে একজন কৃষকের মোট খরচ হয় ২৩ থেকে ২৫ হাজার টাকা।

অথচ ফলন ভালো হওয়ার পরও প্রতি বিঘায় ধানের পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২৪ থেকে ২৫ মণ। বর্তমান বাজারদর অনুযায়ী, ৮০০ টাকা মণ হিসেবে এই ধান বিক্রি করে কৃষকের পকেটে আসছে বড়জোর ২০ হাজার টাকা। অর্থাৎ, হাড়ভাঙা পরিশ্রম করার পরও বিঘাপ্রতি কৃষকের লোকসান হচ্ছে তিন থেকে পাঁচ হাজার টাকা।

জীবনভর মাটি কামড়ে পড়ে থাকা মেলান্দহের প্রবীণ কৃষক সুরুজ মিয়া আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকেই বাবার সঙ্গে মাঠে কাজ করছি। বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে নিজেই পুরো চাষাবাদ সামলাই। কিন্তু আমার জীবনে কৃষিকাজের এমন করুণ অবস্থা আমি কখনো দেখি নাই। বাজারে সবকিছুর দাম হু হু করে বাড়ছে, কামলার মজুরি ১২০০ টাকা, আর আমাদের ধানের দাম মাত্র ৮০০ টাকা। আমার ৯ বিঘা জমির ফসল বিক্রির ওপর নির্ভর করেই পুরো সংসার চলে। এবার বউ-বাচ্চা নিয়ে কী হবে, তা একমাত্র আল্লাহই ভালো জানেন। 

এখন তো মনে হচ্ছে আমাদের মতো কৃষকদের একেবারে মরে যাওয়ার অবস্থা তৈরি হয়েছে।’

একই ধরনের দীর্ঘশ্বাস শোনা যায় আরেক কৃষক রবিউল ইসলামের কণ্ঠেও। হিসাবের খাতা খুলে তিনি বলেন, ‘প্রতি বিঘায় কাঁচা ধান হয় প্রায় ২৮ মণের মতো। কিন্তু রোদে শুকানোর পর তা কমে দাঁড়ায় ২৪-২৫ মণে। এই ধান ফলাতে আমার বিঘাপ্রতি খরচই হয়ে গেছে প্রায় ২৬ হাজার টাকা। এবার ধান বিক্রি করে ২০ হাজার টাকাও তুলতে পারব না। লাভের তো প্রশ্নই আসে না, আসল টাকাই উঠবে না। ধারদেনা করে যে আবাদ করলাম, সেই ঋণ শোধ করব কীভাবে?’

কৃষকদের এই গভীর সংকটের বিষয়ে জামালপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ আলম শরীফ খানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি জানান, সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী চলতি বোরো মৌসুমে পুরো জামালপুর জেলায় মোট এক লাখ ২৬ হাজার ৩৮৫ হেক্টর জমিতে ধানের আবাদ হয়েছে। ফলনও বেশ ভালো হয়েছে। তবে ধানের দাম না পাওয়ায় চাষিদের হতাশার বিষয়টি তিনি স্বীকার করেন।

তিনি বলেন, ‘আমরা কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দিচ্ছি, তারা যেন ধান কাটার পরপরই বিক্রি না করে অন্তত এক বা দুই মাস ধান সংরক্ষণ করেন। একটু দেরি করে বিক্রি করলে বাজারে ধানের ভালো দাম পাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। এছাড়া সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সরবরাহ করলে তারা ন্যায্যমূল্য পাবেন। কিন্তু অভাবের তাড়নায় বা নগদ টাকার প্রয়োজনে পাইকারদের কাছে কম দামে ধান বিক্রি করে দিলে আসলে আমাদের খুব বেশি কিছু করার থাকে না।’


কৃষকের ঘাম আর শ্রমের ওপর ভর করেই সচল থাকে বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা। কিন্তু উৎপাদিত ফসলের এমন চরম দরপতন ও উৎপাদন খরচের সীমাহীন ঊর্ধ্বগতি কৃষককে ধীরে ধীরে কৃষিকাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করতে পারে। সরকারি গুদামে ধান বিক্রির বা মজুত রাখার পরামর্শ দেওয়া হলেও, প্রান্তিক কৃষকদের ঋণ পরিশোধ ও সংসারের নগদ টাকার তাৎক্ষণিক প্রয়োজন মেটাতে তা কতটা বাস্তবসম্মত, সেটি নীতিনির্ধারকদের ভেবে দেখার বিষয়। দালাল ও ফড়িয়াদের দৌরাত্ম্য কমিয়ে কৃষকের দোরগোড়ায় সরাসরি সরকারি ক্রয়কেন্দ্র স্থাপন করা না গেলে এই লোকসানের বৃত্ত ভাঙা সম্ভব নয়। কৃষকের আর্থিক সুরক্ষা নিশ্চিত না হলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তাই একসময় বড় ধরনের হুমকির মুখে পড়বে।

পরবর্তী খবর লোড হচ্ছে...
জাতীয়

ধানের মণ ৮০০, শ্রমিকের মজুরি ১২০০: জামালপুরে লোকসানের মুখে বোরো চাষিরা

R
Roksana | 12 May 2026
বিস্তারিত পড়ুন
new.karatoa.com.bd

Logo

প্রচ্ছদ
সোশ্যাল মিডিয়া ই-পেপার