সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটতে যাচ্ছে। আগামী জুলাই মাস থেকেই বহুল আলোচিত নবম বেতন কাঠামো বা পে-স্কেল কার্যকরের নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। তবে জাতীয় বেতন কমিশনের পুরো সুপারিশ একযোগে বাস্তবায়ন না করে, সামষ্টিক অর্থনীতির কথা বিবেচনা করে তিন ধাপে এই নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সবকিছু ঠিক থাকলে প্রশাসনিক ও আইনি প্রক্রিয়া শেষে আগামী অক্টোবর মাস নাগাদ চাকরিজীবীরা বর্ধিত বেতনের অর্থ হাতে পাওয়া শুরু করবেন।
নতুন বেতন কাঠামোর বাস্তবায়ন কৌশল চূড়ান্ত করতে গত বৃহস্পতিবার (১৮ জুন) মন্ত্রিপরিষদ সচিব নাসিমুল গনির সভাপতিত্বে পুনর্গঠিত সচিব কমিটির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ওই বৈঠকে জাতীয় বেতন কমিশনের সুপারিশ, সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো এবং জুডিসিয়াল সার্ভিস পে-কমিশনের প্রস্তাব নিয়ে দীর্ঘ পর্যালোচনা হয়। তবে সেদিন চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি। এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করতে আগামী ২৪ জুন কমিটির আরেকটি বৈঠক ডাকা হয়েছে।
অর্থ মন্ত্রণালয় ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, ধাপে ধাপে বেতন বৃদ্ধির যে প্রাথমিক ছক কষা হয়েছে, তাতে প্রথম ধাপে (২০২৬-২৭ অর্থবছর) সরকারি, আধা-সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন বাহিনীর কর্মীরা নতুন নির্ধারিত মূল বেতনের (বেসিক) ৫০ শতাংশ পাবেন। এরপর দ্বিতীয় ধাপে (২০২৭-২৮ অর্থবছর) মূল বেতনের বাকি ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। চূড়ান্ত ও তৃতীয় ধাপে (২০২৮-২৯ অর্থবছর) গিয়ে পূর্ণাঙ্গভাবে সব ধরনের ভাতা ও আর্থিক সুবিধাগুলো যুক্ত করা হবে।
ইতিমধ্যেই নবম পে-স্কেল বাস্তবায়নের আনুষ্ঠানিক রূপরেখা স্পষ্ট হয়েছে। গত ১১ জুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেট পেশ করার সময় অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এই নতুন বেতন কাঠামোর ঘোষণা দেন। বাজেটে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ মোট ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর বাইরে পেনশন ও গ্র্যাচুইটির হিসাব মেলালে মোট বরাদ্দের পরিমাণ দাঁড়ায় ১ লাখ ২৫ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা। এছাড়া জনপ্রশাসন খাতে থোক বরাদ্দ হিসেবে রাখা প্রায় ৪৪ হাজার কোটি টাকা মূলত নতুন বেতন কাঠামোর আংশিক বাস্তবায়নেই ব্যয় হবে বলে অর্থ মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে।
এর আগে চলতি বছরের ২১ জানুয়ারি সাবেক অর্থসচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২১ সদস্যের বেতন কমিশন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে তাদের চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। দেশের মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার মান বিবেচনায় নিয়ে অনলাইনে প্রায় ২ লাখ ৩৬ হাজার মানুষের মতামত সংগ্রহ করে এই সুপারিশমালা তৈরি করা হয়েছিল।
কমিশনের সুপারিশে বেশ কিছু যুগান্তকারী পরিবর্তনের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি চাকরিজীবীদের বৈশাখী ভাতা ২০ শতাংশ থেকে বাড়িয়ে ৫০ শতাংশ করার কথা বলা হয়েছে। এছাড়া নিম্ন গ্রেডের কর্মচারীদের সুবিধার্থে দশম থেকে ২০তম গ্রেড পর্যন্ত যাতায়াত ভাতা প্রদান এবং ১১তম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের জন্য বাড়িভাড়ার হার তুলনামূলক বেশি রাখার সুপারিশ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত নতুন কাঠামোতে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতনের বড় ধরনের উল্লম্ফন ঘটতে যাচ্ছে। সুপারিশ অনুযায়ী, সর্বোচ্চ অর্থাৎ প্রথম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০তম গ্রেডের মূল বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার টাকা। এছাড়া দ্বিতীয় গ্রেডের বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার, নবম গ্রেডের ৪৫ হাজার ১০০ থেকে ১ লাখ ৮ হাজার ৮০০ এবং দশম গ্রেডের বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। সরকারের এই যুগান্তকারী পদক্ষেপে লাখ লাখ সরকারি চাকরিজীবী ও তাদের পরিবারের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।