আসন্ন পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে প্রিয়জনদের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগ করে নিতে রাজধানী ছাড়তে শুরু করেছে সাধারণ মানুষ। সরকারি ছুটির আরও বাকি থাকলেও ঝামেলা এড়াতে এবং স্বস্তিময় যাত্রার আশায় অনেকেই আগেভাগে ঢাকা ছাড়ছেন।
ঈদ মানেই আনন্দ, আর সেই আনন্দ প্রিয়জনদের সঙ্গে ভাগ করে নিতে প্রতি বছরই রাজধানী ছাড়েন লাখ লাখ মানুষ। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি। আগামী ২৮ মে ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে। তবে ঈদের মূল সরকারি ছুটি শুরু হওয়ার আগেই ঘরমুখো মানুষের স্রোত নামতে শুরু করেছে ঢাকার বিভিন্ন রেলস্টেশন ও বাস টার্মিনালগুলোতে। শনিবার সকাল থেকেই কমলাপুর ও বিমানবন্দর রেলস্টেশন এবং মহাখালী, গাবতলী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালগুলোতে যাত্রীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
গত শুক্রবারের তুলনায় শনিবার যাত্রীদের চাপ অনেকটাই বেড়েছে। বিশেষ করে উত্তরবঙ্গগামী ট্রেনগুলোতে ভিড় ছিল সবচেয়ে বেশি। তবে পূর্বাঞ্চলগামী ট্রেনগুলোতে তুলনামূলক কিছুটা স্বস্তি দেখা গেছে। অন্যদিকে, দূরপাল্লার বাসগুলো এখন পর্যন্ত নির্দিষ্ট সময়েই টার্মিনাল ছেড়ে যাচ্ছে বলে পরিবহন সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। তবে কিছু কিছু রুটে অতিরিক্ত যাত্রী ও যানবাহনের চাপের কারণে ধীরগতি ও সাময়িক ভোগান্তির খবর পাওয়া গেছে।
ঈদের সরকারি ছুটি শুরু হতে দেরি থাকলেও অনেক চাকরিজীবী নিজেদের পরিবারকে আগেভাগেই গ্রামে পাঠিয়ে দিচ্ছেন। তাদের মতে, ঈদ যত ঘনিয়ে আসবে, যাতায়াতের ভিড় এবং ঝক্কি ততটাই বাড়বে। তাই শেষ মুহূর্তের ঠেলাঠেলি এবং ভোগান্তি এড়াতে স্ত্রী, সন্তান ও বয়োজ্যেষ্ঠ বাবা-মাকে আগেই বিদায় দিচ্ছেন তারা। ট্রেনের অগ্রিম টিকিট কাটা যাত্রীরা জানিয়েছেন, শেষ মুহূর্তের ভিড়ে নারী ও শিশুদের নিয়ে যাতায়াত করা অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই তারা আগেভাগেই বাড়ি ফেরার পথ বেছে নিয়েছেন।
যদিও শনিবার সকালে ঢাকা থেকে বেশ কয়েকটি ট্রেন ছেড়ে যেতে কিছুটা দেরি হয়েছে। চট্টগ্রামগামী ‘মহানগর প্রভাতী’ এবং চিলাহাটিগামী ‘নীলসাগর এক্সপ্রেস’ সহ কয়েকটি আন্তঃনগর ট্রেন নির্ধারিত সময়ের চেয়ে কিছুটা দেরিতে কমলাপুর স্টেশন ত্যাগ করে। তবে সময়সূচির (শিডিউলের) এই সামান্য বিলম্ব যাত্রীদের উৎসাহ ও আনন্দের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। যাত্রীদের অনেকেই জানিয়েছেন, স্বাভাবিক সময়েও ট্রেনের যাতায়াতে এমন সামান্য দেরি হয়ে থাকে। নিরাপদে এবং নির্বিঘ্নে বাড়ি পৌঁছাতে পারলেই তারা খুশি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ছুটি হয়ে যাওয়ায় তরুণ ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। সুলতান নামের এক কলেজ শিক্ষার্থী জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। শেষ মুহূর্তে স্টেশনে ও গাড়িতে মানুষের প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়, তাই কোনো রকম ঝামেলা ছাড়াই সে আগেভাগে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছে।
রেলওয়ে কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, শনিবার দিনভর ঢাকা থেকে ৪৬টি আন্তঃনগর ট্রেন এবং ২৩টি লোকাল ও কমিউটার (স্বল্প দূরত্বের সংযোগ ট্রেন) ট্রেন দেশের বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যাবে। পুরো দিনে প্রায় ৪৫ হাজার যাত্রী আসনের টিকিট নিয়ে এবং আরও ১৫ থেকে ২০ হাজার যাত্রী আসনবিহীন (স্ট্যান্ডিং) টিকিট নিয়ে যাতায়াত করতে পারবেন।
কমলাপুর রেলস্টেশন পরিদর্শনকালে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম বলেন, ট্রেনের সময়সূচি বিপর্যয় ঠেকাতে এবং যাত্রীদের নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে রেলওয়ের সব ধরনের প্রস্তুতি রয়েছে। এবারের ঈদযাত্রায় বড় ধরনের কোনো সময়সূচি বিপর্যয়ের আশঙ্কা নেই। পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা সম্পূর্ণ রোধ করতে স্টেশনে বাড়তি নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ঈদযাত্রা নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক করতে কেবল রেলস্টেশন নয়, বাস টার্মিনাল ও জাতীয় মহাসড়কগুলোতেও নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ ও র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নসহ (র্যাব) বিভিন্ন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। মহাখালী বাস টার্মিনালে দায়িত্বরত ট্রাফিক পরিদর্শক (ট্রাফিক ইন্সপেক্টর) ওমর ফারুক বলেন, যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করা হচ্ছে কি না এবং মহাসড়কে কোনো ধরনের চাঁদাবাজি হচ্ছে কি না, তা কঠোরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। যানজট নিয়ন্ত্রণেও ট্রাফিক পুলিশ রাস্তায় সক্রিয় রয়েছে।
প্রতি বছর ঈদের সময় লাখ লাখ মানুষের ঢাকা ছাড়ার এই বিশাল চাপ সামলানো আমাদের দেশের অবকাঠামো ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ট্রেনের টিকিট প্রাপ্তি ও যাতায়াত ব্যবস্থা আগের চেয়ে কিছুটা উন্নত হলেও সময়সূচি বজায় রাখা এবং মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষা করা এখনও একটি বড় অমীমাংসিত বিষয়। তবে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং যাত্রীদের নিজেদের সচেতনতা ও ধৈর্যশীল আচরণ বজায় থাকলে এবারের ঈদযাত্রা আরও সহজ এবং উৎসবমুখর হয়ে উঠতে পারে।