জুলাই গণঅভ্যুত্থানে দেশের মানুষ দল-মত নির্বিশেষে রাজপথে নেমে এসেছিল এবং তাদের এই আত্মত্যাগকে সর্বোচ্চ সম্মান জানাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা একক ব্যক্তির নয়, বরং এটি এ দেশের আপামর জনসাধারণের এক ঐতিহাসিক অর্জন।
শনিবার রাজধানীর চীন-মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জুলাই আন্দোলনে শহীদদের স্মরণে আয়োজিত ‘জুলাই জাতীয় সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী স্মরণ করিয়ে দেন, জুলাই মাসে দেশের বহু মানুষ যে জীবন উৎসর্গ করেছেন, তার একমাত্র লক্ষ্য ছিল একটি বৈষম্যহীন ও ইতিবাচক পরিবর্তন ফিরিয়ে আনা।
বক্তব্যে অপরাধীদের বিচারের ব্যাপারে সরকারের দৃঢ় অবস্থানের কথা জানান সরকারপ্রধান। তিনি বলেন, "যারা এ দেশের নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে, দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী তাদের বিচার নিশ্চিত করা হবে। বিগত স্বৈরাচারী সরকার যেমন বিচারের নামে অবিচার চালিয়েছিল, আমরা যেন বিচারের নামে তেমন কোনো অন্যায়ের পুনরাবৃত্তি না করি। এ বিষয়ে আমাদের অত্যন্ত সতর্ক থাকতে হবে। প্রয়োজনে কিছুটা সময় লাগবে, তবুও দেশের প্রচলিত আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই যেন প্রকৃত বিচার নিশ্চিত হয়।"
একটি কল্যাণমুখী ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করে তারেক রহমান বলেন, "আমরা এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলতে চাই, যেখানে প্রতিটি নাগরিক তাঁর ন্যায্য অধিকার এবং আত্মমর্যাদা ফিরে পাবেন। যেখানে সবার জন্য একটি নিরাপদ ও শান্তিময় রাষ্ট্র নিশ্চিত করা হবে।" তিনি আরও যোগ করেন, জাতিকে বিভক্ত রেখে কোনোভাবেই দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব নয়। তাই যাঁরা বাংলাদেশের অস্তিত্ব ও অখণ্ডতায় বিশ্বাস করেন, দেশের বৃহত্তর স্বার্থে তাঁদের ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান তিনি।
বক্তব্যের একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের আবেগময় অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, "দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে আমার পরিবারের ওপর যে জুলুম ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়েছে, সে বিষয়ে যদি আজ আমার মাকে জিজ্ঞেস করতাম যে—মা, যারা আপনার ওপর এই অন্যায় করেছে, তাদের প্রতি কি আপনার মনে কোনো প্রতিশোধের আকাঙ্ক্ষা নেই? তবে আমার মা বলতেন, প্রতিহিংসা কোনো সমাধান নয়; বরং দেশের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাওয়াই তোমার মূল দায়িত্ব।"
তিনি আরও বলেন, একই প্রশ্ন করলে তাঁর প্রয়াত ভাইও ঠিক একই উত্তর দিতেন। বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে বহু সহকর্মীকে হারানোর বেদনা এবং অনেকের পঙ্গুত্বের যন্ত্রণার কথা স্মরণ করে প্রধানমন্ত্রী আবেগ আপ্লুত হয়ে পড়েন।
জাতীয় সংসদের হুইপ (সংসদীয় কার্যপরিচালক) নূরুল ইসলাম মনির সভাপতিত্বে এই স্মরণসভায় জুলাই বিপ্লবের শহীদ ও চিকিৎসাধীন আহতদের পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে শহীদদের স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে দাঁড়িয়ে এক মিনিট নীরবতা পালন করা হয়। স্মরণসভায় মন্ত্রিসভার সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যগণ, দেশের শীর্ষস্থানীয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও উচ্চ কমিশনারবৃন্দ (হাইকমিশনার), সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং বিশিষ্ট পেশাজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।