দেশের সার্বিক উন্নয়নের গতি ত্বরান্বিত করতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে চলছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বৈঠক। মঙ্গলবার সকালে শুরু হওয়া এই সভায় স্বাস্থ্য, অবকাঠামো ও অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ মোট আট হাজার একশ ছয় কোটি টাকা ব্যয়ের ১২টি উন্নয়ন প্রকল্প চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হয়েছে।
রাজধানীতে মঙ্গলবার (৯ জুন) সকাল দশটা থেকে শুরু হয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (যাকে সংক্ষেপে একনেক বলা হয়, এটি দেশের উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের সর্বোচ্চ ফোরাম) এক অতি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এই সভাটি বর্তমান চলতি অর্থবছরের ১২তম এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) নেতৃত্বাধীন সরকারের চতুর্থ একনেক বৈঠক। দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও ধারাবাহিক উন্নয়নের স্বার্থে আজকের এই সভাটি নীতি-নির্ধারকদের কাছে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে বিবেচিত হচ্ছে।
সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আজকের এই একনেক সভায় নতুন ও পূর্বের সংশোধিত মিলিয়ে মোট ১২টি মেগা ও মাঝারি উন্নয়ন প্রকল্প অনুমোদনের জন্য টেবিলে তোলা হয়েছে। প্রস্তাবিত এই প্রকল্পগুলোর কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সম্ভাব্য মোট ব্যয়ের পরিমাণ ধরা হয়েছে আট হাজার একশ ছয় কোটি টাকা। দেশের সুষম উন্নয়নের লক্ষ্যে এই বিপুল অঙ্কের অর্থ নির্দিষ্ট কোনো একক খাতে আবদ্ধ না রেখে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে ভাগ করে দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত প্রকল্পগুলো মূলত অবকাঠামো উন্নয়ন, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্যসেবা, তথ্যপ্রযুক্তি, স্থানীয় সরকার, বিদ্যুৎ ও জ্বালানি এবং সামাজিক নিরাপত্তা খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে প্রস্তুত করেছে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের আপামর জনসাধারণের জীবনমান উন্নয়নে এই খাতগুলোতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
আজকের সভার সবচেয়ে বড় চমক ও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় প্রস্তাবিত ‘চীনা অর্থনৈতিক জোন স্থাপন’ প্রকল্পটি। জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন ও বহুল প্রতীক্ষিত চীন সফরের ঠিক আগেই এই মেগা প্রকল্পটি একনেকের চূড়ান্ত অনুমোদন পেতে পারে। প্রায় চার হাজার কোটি টাকা বিশাল বাজেটের এই প্রকল্পটি চট্টগ্রামের আনোয়ারায় আটশ একর সুবিশাল জায়গাজুড়ে বাস্তবায়িত হবে। অর্থনীতিবিদদের মতে, এই অর্থনৈতিক অঞ্চলটি প্রতিষ্ঠিত হলে দেশে বিপুল পরিমাণ বিদেশি বিনিয়োগ আসার পাশাপাশি হাজারো বেকার তরুণের কর্মসংস্থানের এক বিশাল দ্বার উন্মোচিত হবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে এক যুগান্তকারী পরিবর্তন আনতে সক্ষম।
এছাড়া দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম তথা শিশুদের সুস্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সুরক্ষা আরও শক্তিশালী ও যুগোপযোগী করার লক্ষ্যে ‘বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট সম্প্রসারণ প্রকল্প-২’ নামে একটি নতুন অত্যন্ত সময়োপযোগী প্রকল্প প্রস্তাব একনেকে তোলা হয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মেয়াদ ধরা হয়েছে আগামী জুলাই মাস থেকে শুরু করে ২০২৮ সালের জুন মাস পর্যন্ত। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পটি সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে সম্ভাব্য ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে তিনশ চুয়াল্লিশ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে শিশু মৃত্যুর হার কমানো এবং উন্নত চিকিৎসার সুযোগ ঢাকার বাইরেও প্রসারিত করার দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।
উন্নয়নের এই বিশাল কর্মযজ্ঞের পাশাপাশি যোগাযোগ ব্যবস্থা ও ভূমি ব্যবস্থাপনাকে আধুনিকায়নের লক্ষ্যে আরও কয়েকটি বড় প্রকল্প আজকের একনেক সভায় অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ‘আনোয়ারা-বাঁশখালী-চকরিয়া আঞ্চলিক মহাসড়ক উন্নয়ন’ প্রকল্প এবং ‘সমন্বিত উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণ’ প্রকল্প। মহাসড়ক প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ চট্টগ্রামের বিশাল একটি অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে, যা স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও কৃষি অর্থনীতিকে দারুণভাবে চাঙ্গা করবে। অন্যদিকে, উপজেলা ভূমি কমপ্লেক্স নির্মাণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের ভোগান্তি দূর করে ভূমি সেবাকে আরও আধুনিক, দুর্নীতিমুক্ত ও জনবান্ধব করে তোলা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
দেশের অর্থনৈতিক চাকা সচল রাখতে এবং প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় উন্নয়নের সুফল পৌঁছে দিতে একনেকে উত্থাপিত এই আট হাজার কোটি টাকার প্রকল্পগুলো নিঃসন্দেহে অত্যন্ত ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ। বিশেষ করে বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে অর্থনৈতিক জোন প্রতিষ্ঠা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য শিশু হাসপাতাল সম্প্রসারণের মতো উদ্যোগগুলো দীর্ঘমেয়াদি সুফল বয়ে আনবে। তবে আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ও দুর্নীতিমুক্ত উপায়ে প্রকল্পগুলোর শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা। জনগণের করের টাকার এই বিপুল অর্থের প্রতিটি পয়সার সঠিক ব্যবহার এবং কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে পারলে তবেই এই উন্নয়ন প্রকল্পগুলো দেশের জন্য সত্যিকারের আশীর্বাদ হয়ে ধরা দেবে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো কতোটা দক্ষতার সঙ্গে এই বিশাল কর্মযজ্ঞ নির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে শেষ করতে পারে।