চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে অনৈতিক ও বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক স্থাপনের দায়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সাবেক অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) মো. গোলাম সাকলায়েনকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে সরকার। তিনি বর্তমানে ঝিনাইদহ ইন-সার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হিসেবে কর্মরত ছিলেন।
বৃহস্পতিবার স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের শৃঙ্খলা-২ শাখা থেকে জারি করা এক প্রজ্ঞাপনে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কথা আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে এই প্রজ্ঞাপনে সই করেন মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলা দেশব্যাপী আলোচনা ও বিতর্কের আইনি সমাপ্তি ঘটল।
প্রজ্ঞাপনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, ডিবি গুলশান বিভাগের এডিসি হিসেবে কর্মরত থাকার সময় গোলাম সাকলায়েন একজন দায়িত্বশীল পুলিশ কর্মকর্তা হয়েও সরকারি দায়িত্বের সীমানা পেরিয়ে চিত্রনায়িকা পরীমনির সঙ্গে নৈতিকতাবহির্ভূত ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। একটি গুরুত্বপূর্ণ মামলার তদন্তের দায়িত্ব পালনের সময় তিনি এই সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যা পেশাদারি মূল্যবোধের চরম লঙ্ঘন।
সরকারি নথিতে বলা হয়, সাকলায়েন বিবাহিত এবং এক সন্তানের জনক হওয়া সত্ত্বেও পরীমনির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপন করেন। স্ত্রীর অবর্তমানে নিজের সরকারি বাসভবনে পরীমনিকে নিয়ে সময় কাটানো এবং একসঙ্গে জন্মদিন উদযাপনের মতো ঘটনাগুলো বিভিন্ন গণমাধ্যমে ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়। সরকারের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার এমন অপেশাদার ও দৃষ্টিকটু আচরণে পুলিশ বাহিনী তথা সরকারের ভাবমূর্তি চরমভাবে ক্ষুণ্ন হয়েছে।
শৃঙ্খলাভঙ্গের এই গুরুতর অভিযোগের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি সাকলায়েনের বিরুদ্ধে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ অনুযায়ী ‘অসদাচরণ’-এর অভিযোগে বিভাগীয় মামলা দায়ের করা হয়। এরপর তাকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি গত বছরের ১৯ মার্চ জবাব দেন এবং ২৮ মার্চ তার ব্যক্তিগত শুনানি গ্রহণ করা হয়। তবে তার জবাবে কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট না হওয়ায় অভিযোগের গভীরে গিয়ে তদন্তের জন্য একই বছরের ৩০ আগস্ট একজন তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২৩ সালের ১২ ডিসেম্বর দাখিল করা প্রতিবেদনে সাকলায়েনের বিরুদ্ধে আনা অসদাচরণের অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয় বলে তদন্ত কর্মকর্তা মতামত দেন। অপরাধের মাত্রা ও গুরুত্ব বিবেচনা করে তাকে গুরুদণ্ড দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় কর্তৃপক্ষ। আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে চলতি বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি তাকে দ্বিতীয়বারের মতো কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয় এবং তিনি ১০ মার্চ এর লিখিত জবাব দেন।
সবশেষ জবাব, তদন্ত প্রতিবেদন এবং পারিপার্শ্বিক সব বিষয় পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করে সাকলায়েনকে চাকরি থেকে ‘বাধ্যতামূলক অবসর’ দেওয়ার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এরপর বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) আইনি পরামর্শ চাওয়া হলে তারাও এই গুরুদণ্ড আরোপের পক্ষে সম্মতি প্রদান করে। সর্বশেষ, নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষ হিসেবে মহামান্য রাষ্ট্রপতি গত ১৭ জুন এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থায় সানুগ্রহ অনুমোদন দেন। এরই ধারাবাহিকতায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত প্রজ্ঞাপন জারির মাধ্যমে তাকে সরকারি চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাল।